রয়টার্সের বিশ্লেষণ: প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান
ঢাকা: প্রায় দুই দশক লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর দেশে ফিরে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এই নির্বাচনে জয়লাভ করে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন তারেক রহমান।
মঙ্গলবার প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, জনমত জরিপগুলো সঠিক হলে বৃহস্পতিবারের নির্বাচন ৬০ বছর বয়সী এই মৃদুভাষী নেতার রাজনৈতিক জীবনে এক বড় মোড় আনতে পারে। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গ্রেপ্তার হয়ে মুক্তি পাওয়ার পর চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান তিনি এবং দীর্ঘ সময় সেখানেই অবস্থান করেন।
গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। ঢাকায় অবতরণের পর তাকে ঘিরে দলীয় নেতাকর্মীদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। এরপর থেকে তিনি দেশজুড়ে ব্যাপক নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে সময় কাটিয়েছেন।
অন্যদিকে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে দিল্লিতে অবস্থান করছেন। তারেক রহমানের মা প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার আধিপত্য ছিল। তারেক রহমানের বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শীর্ষ নেতা এবং ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শেখ হাসিনা ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিপরীতে তারেক রহমান বাংলাদেশকে কোনো একক দেশের ওপর নির্ভরশীল না রেখে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব পুনর্গঠনের মাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছেন।
তার ঘোষিত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে—দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি, খেলনা ও চামড়াজাত শিল্পের মতো খাতে জোর দিয়ে পোশাক রপ্তানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই দফা বা ১০ বছরে সীমাবদ্ধ করা।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, “ঢাকায় ফেরার পর থেকে প্রতিটি মিনিট কীভাবে কেটে গেছে, তা বুঝে ওঠার সময়ই পাইনি।” তিনি জানান, তার মেয়ে জাইমা রহমান নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে তার পক্ষে সমর্থন আদায়ে ভূমিকা রেখেছেন।
বদলে যাওয়া রাজনৈতিক দৃশ্যপট
১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করা তারেক রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও পরবর্তীতে ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন। দেশে ফেরার পর নিজেকে একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন তিনি।
তার বিরুদ্ধে থাকা দুর্নীতি ও অন্যান্য মামলাগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, “প্রতিশোধ মানুষকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। এতে ভালো কিছু আসে না। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শান্তি ও স্থিতিশীলতা।”
শেখ হাসিনার শাসনামলে তারেক রহমান একাধিক মামলায় অনুপস্থিতিতে দোষী সাব্যস্ত হন। ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলা মামলায় ২০১৮ সালে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলেও তিনি শুরু থেকেই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর এসব মামলা থেকে তিনি খালাস পান।
লন্ডনে নির্বাসিত অবস্থায় থেকেই তিনি দলের ওপর নেমে আসা দমন-পীড়নের চিত্র প্রত্যক্ষ করেছেন—শীর্ষ নেতাদের কারাবরণ, কর্মীদের গুম ও দলীয় কার্যালয় বন্ধের ঘটনাও উঠে এসেছে রয়টার্সের প্রতিবেদনে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন তারেক রহমানের জন্য শুধু ক্ষমতায় ফেরার লড়াই নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনাও হতে পারে।
