উচ্চ সুদ-ডলার চাপ ও জ্বালানি সংকটে বেসরকারি খাত স্থবির
দীর্ঘদিনের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ সুদহার, তীব্র জ্বালানি সংকট এবং ডলারের দামের ঊর্ধ্বগতির চাপে দেশের বেসরকারি খাত কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি এই খাতেই এখন বিনিয়োগ কমছে, ঋণপ্রবাহ নেমেছে ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে। উদ্যোক্তারা বলছেন, স্থবির অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করাতে নতুন সরকারের সুস্পষ্ট নীতিগত দিকনির্দেশনা জরুরি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের আস্থা দ্রুত ফিরিয়ে আনা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। দেশে মোট দেশজ উৎপাদনের ৭৮ থেকে ৮৬ শতাংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে, আর মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৯৫ শতাংশই সৃষ্টি হয় এ খাতে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬ দশমিক ১ শতাংশে, যা ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ঋণের সুদহার ১৬ থেকে ১৭ শতাংশে পৌঁছানোয় নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ কমছে।
জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থার হিসাবে চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সময় থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অর্থনৈতিক মন্থরতা নতুন রাজনৈতিক সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের হার রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে পৌঁছানো এবং ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতে, উচ্চ নীতিসুদের কারণে উদ্যোক্তারা এখন ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে অনেক শিল্পকারখানা অর্ধেকের কম সক্ষমতায় উৎপাদন চালাচ্ছে এবং লোকসানের ঝুঁকি বাড়ছে।
জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করেছে। ঘন ঘন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসের দাম বাড়ায় অভ্যন্তরীণ বাজার ও রপ্তানি লক্ষ্য পূরণ কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে ডলারের দাম ১২২ টাকার বেশি হওয়ায় কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ব্যয় বেড়েছে। ফলে বেসরকারি খাতে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে ঋণ গ্রহণেও।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিও ব্যবসায়িক আস্থাকে দুর্বল করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ী নেতারা জানান, অন্তর্বর্তী সময়ে চাঁদাবাজি বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক অস্থিরতা বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, অস্থিরতার মধ্যে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ৬১ দশমিক ৫৩ শতাংশ কমেছে। শিল্প খাত সংশ্লিষ্টদের দাবি, অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে উৎপাদন কমানো, শ্রমিক ছাঁটাই এবং নতুন প্রকল্প স্থগিত রাখতে বাধ্য হচ্ছে।
তৈরি পোশাক খাতের সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে ৩৫৩টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৪২ শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, নীতিগত ঘাটতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় দুর্বল সম্পৃক্ততার কারণে শিল্প খাত সম্ভাব্য অনেক সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা জোর দিচ্ছেন—আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, চাঁদাবাজি দমন, বিনিয়োগবান্ধব নীতি প্রণয়ন এবং সরকার-ব্যবসায়ী সংলাপ জোরদারের ওপর। তাদের মতে, সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, টেকসই বিনিময় হার নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকিং খাতের তারল্য উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।
অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো সরকার উপলব্ধি করছে এবং সংস্কার কর্মসূচির আওতায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, দ্রুত ও দৃঢ় সংস্কার উদ্যোগ এবং কাঠামোবদ্ধ সংলাপই পারে বেসরকারি খাতে আবার গতি ফিরিয়ে আনতে। তা না হলে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আল আমিন খান , মোবাইলঃ ০১৩০৪৩৬৭৪৮১. ই-মেইলঃ dailycrimebangla@gmail.com