রূপপুরে ইউরেনিয়াম লোডিং শুরু, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে বাংলাদেশের প্রবেশ
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নতুন এক মাইলফলক স্থাপিত হলো। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-এর প্রথম ইউনিটে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরেনিয়াম ফুয়েল লোডিং শুরু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি পর্বে প্রবেশ করল এবং বাংলাদেশ যুক্ত হলো পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষম দেশগুলোর কাতারে।
বেলা সাড়ে ৩টার পর ফুয়েল লোডিং কার্যক্রম শুরু হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের মতে, এটি কেবল একটি কারিগরি ধাপ নয়, বরং বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল যাত্রার সূচনা। ফুয়েল লোডিং সম্পন্ন হওয়ার পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জুলাইয়ের শেষ বা আগস্টের মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে এই ধাপটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকগুলোর একটি। পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান শৌকত আকবরের ভাষায়, “ফুয়েল লোডিংয়ের মধ্য দিয়ে দেশ মূল উৎপাদন পর্যায়ে প্রবেশ করছে।” তিনি জানান, পরবর্তী ধাপে ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ অর্জনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হবে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভিত্তি।
প্রকল্প এলাকায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা-এর মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রাকে স্বাগত জানান। রুশ রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম-এর মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভ বলেন, “বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের নতুন এক যুগে প্রবেশ করল।”
রূপপুর প্রকল্পে দুটি ইউনিট থেকে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় গেলে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে পূর্ণ সক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই প্রকল্পের যাত্রা দীর্ঘদিনের। ১৯৬১ সালে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের প্রাথমিক উদ্যোগ থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পর নতুন পরিকল্পনা, ২০১১ সালে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি এবং পরবর্তী নির্মাণকাজ—সব মিলিয়ে কয়েক দশকের পথ পেরিয়ে এখন বাস্তব উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে দেশ।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ফুয়েল লোডিং একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও উচ্চ নিরাপত্তাসম্পন্ন প্রক্রিয়া। প্রথম ইউনিটে মোট ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরে স্থাপন করা হবে, যা সম্পন্ন হতে প্রায় ৪৫ দিন সময় লাগতে পারে।
সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, এটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি প্রকল্প নয়; বরং জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। প্রায় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্প দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বড় অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে রূপপুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার একটি প্রতীক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আল আমিন খান , মোবাইলঃ ০১৩০৪৩৬৭৪৮১. ই-মেইলঃ dailycrimebangla@gmail.com