নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র এলাকায় ভয়াবহ পানিসংকট ক্রমেই গভীরতর হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বছরের পর বছর নির্বিচারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে মাটির নিচের পানিধারক স্তর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হলেও সেই পানি আর আগের মতো মাটির নিচে জমা হতে পারছে না। এতে একদিকে যেমন সেচব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, অন্যদিকে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিস্তীর্ণ কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়ছে। এমনকি অনেক এলাকায় সুপেয় পানির সংকটও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
সরকার ইতোমধ্যে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার ২৫টি উপজেলার ৪৭টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৪৬৯টি মৌজাকে ‘অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন’ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে। ওইসব এলাকায় খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কোনো কাজে নতুন নলকূপ স্থাপন ও ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তবে বাস্তবে এসব নির্দেশনা কার্যকর হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচের জন্য সরকারের নির্ধারিত সর্বোচ্চ গভীর নলকূপের সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ৪০০টি। কিন্তু বর্তমানে ওই এলাকায় ৬২ হাজার শ্যালো টিউবওয়েল এবং প্রায় ৪ হাজার গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। বেসরকারিভাবে পরিচালিত এসব নলকূপের পানি উত্তোলন সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার গভীর নলকূপের সমান। ফলে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে অনেক এলাকায় পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে।
ভুক্তভোগী কৃষকরা জানান, কয়েক বছর আগেও যে জমিতে সহজেই সেচ দেওয়া যেত, এখন সেখানে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। সেচের খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক চাষাবাদ কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। কিছু এলাকায় জমি পতিতও পড়ে আছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে কোনো কার্যকর সমীক্ষা ছাড়াই ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন চলতে থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় পানিধারক স্তরের বালুকণা শুকিয়ে ধুলায় পরিণত হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি আর স্বাভাবিকভাবে মাটির নিচে প্রবেশ করতে পারছে না। এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্বাভাবিক পুনর্ভরণ (রিচার্জ) প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
পানি আইন অনুযায়ী, সংকটাপন্ন এলাকায় খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কোনো কাজে নতুন নলকূপ স্থাপন করা যাবে না। পাশাপাশি বিদ্যমান নলকূপ ব্যবহার করে পানীয় জলের সরবরাহ অব্যাহত রেখে পর্যায়ক্রমে সেচকাজে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন, জলাধারের শ্রেণি পরিবর্তন এবং জলাশয়ের সম্পূর্ণ পানি আহরণের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এসব বিধিনিষেধ অমান্য করা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
তবে বাস্তবে এসব নিয়মের কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেকেই আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে সাবমারসিবল পাম্পের মাধ্যমে সেচকাজে ভূগর্ভস্থ পানি তুলছেন। পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ কিছু ক্ষেত্রে জরিমানা করলেও অবৈধ পানি উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
জানা গেছে, ১৯৮৫-৮৬ সালে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) প্রথম বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করে সেচ কার্যক্রম শুরু করে। পরে ১৯৯৩ সাল থেকে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) ওই কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
বর্তমানে অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন এলাকায় বিএমডিএর ৩ হাজার ৭৭টি গভীর নলকূপ রয়েছে। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ৫০২টি নলকূপ রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, নাচোলের কিছু এলাকায় ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারির মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ২৯ দশমিক ০৯ মিটার থেকে ৩১ দশমিক ০৪ মিটারে নেমে গেছে।
এ বিষয়ে বিএমডিএর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবুল কাশেম বলেন, “সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংখ্যক নলকূপ থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে ব্যক্তিমালিকানাধীন নলকূপের সংখ্যা অনেক বেশি। বিএমডিএ মোট পানির মাত্র ২৭ শতাংশ উত্তোলন করে, বাকি ৭৩ শতাংশ পানি ব্যক্তিমালিকানাধীন পাম্পের মাধ্যমে তোলা হয়, যা কার্যত নিয়ন্ত্রণের বাইরে।”
তিনি আরও জানান, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে বিএমডিএ বর্তমানে সেচকাজে প্রায় ২২ শতাংশ ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করছে। ২০৩০ সালের মধ্যে তা ৩০ শতাংশ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে ৫৪৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের এক-তৃতীয়াংশ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আগামী দুই বছরের মধ্যে অতিরিক্ত ১০ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দেওয়া সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি সংকট মোকাবিলায় ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি, জলাশয় সংরক্ষণ, খাল-পুকুর পুনঃখনন এবং অবৈধ নলকূপ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষি অঞ্চল বরেন্দ্র ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ পানি সংকটের মুখোমুখি হতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আল আমিন খান , মোবাইলঃ ০১৩০৪৩৬৭৪৮১. ই-মেইলঃ dailycrimebangla@gmail.com