
নিজস্ব প্রতিবেদক:
টানা কয়েক দিনের তীব্র তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে উত্তরাঞ্চলের জনজীবন। প্রচণ্ড রোদ ও ভ্যাপসা গরমে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন কৃষক ও কৃষি শ্রমিকরা। মাঠে কাজ করতে গিয়ে তারা দীর্ঘ সময় টিকতে পারছেন না। কিছুক্ষণ পরপরই গাছের ছায়া কিংবা খড়ের গাদার পাশে গিয়ে বিশ্রাম নিতে হচ্ছে। এতে কৃষিকাজের গতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের আয়ও কমে গেছে।
বর্তমানে রংপুর অঞ্চলে বোরো ধান ও ভুট্টা কাটার শেষ পর্যায়ের কাজ চলছে। একই সঙ্গে কাটা ফসল শুকিয়ে ঘরে তোলার কাজেও ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। তবে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে এসব কাজে দেখা দিয়েছে ধীরগতি।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা চাঁপারতল গ্রামের কৃষি শ্রমিক এন্তাজ আলী বলেন, “কয়েকদিন আগেও বৃষ্টির কারণে মাঠে নামতে পারিনি। এখন বৃষ্টি নেই, কিন্তু গত কয়েকদিনের প্রচণ্ড গরমে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। মাঠে এক ঘণ্টা কাজ করলেই শরীর জ্বলে ওঠে। বাধ্য হয়ে ছায়ায় গিয়ে বিশ্রাম নিতে হয়।”
একই এলাকার কৃষি শ্রমিক আলম মিয়া জানান, ধান ও ভুট্টা কাটার মৌসুমে সাধারণত ছয়জনের একটি দল দুই ঘণ্টায় এক বিঘা ধান এবং তিন ঘণ্টায় এক বিঘা ভুট্টা কাটতে পারে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে একই কাজ করতে প্রায় তিনগুণ বেশি সময় লাগছে। ফলে আয়ও কমে গেছে।
হাতীবান্ধা উপজেলার গোতামারী গ্রামের কৃষি শ্রমিক বেলাল মিয়া বলেন, “তাপপ্রবাহে আমরা অস্থির হয়ে পড়েছি। সারাক্ষণ শরীর থেকে ঘাম ঝরছে। চুক্তি অনুযায়ী কাজ শেষ করতে না পারায় মজুরিও কম পাচ্ছি। সংসারের প্রয়োজনে বাধ্য হয়েই মাঠে নামতে হচ্ছে। আগের তুলনায় আয় এখন অর্ধেকেরও কম।”
চর গড্ডিগারী গ্রামের নারী কৃষি শ্রমিক আলেয়া বেগম বলেন, তীব্র গরমের কারণে নারী শ্রমিকরা মাঠে দীর্ঘ সময় কাজ করতে পারছেন না। ফলে অনেকে মাঠের কাজের পরিবর্তে বাড়িতে ধান ও ভুট্টা শুকানোর কাজে যুক্ত হচ্ছেন। তবে খেতে থাকা ফসল কাটতে গিয়ে কৃষকদের বড় সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।
সিঙ্গীমারী গ্রামের কৃষক সালাদ মিয়া বলেন, “খেতের ধান পেকে গেছে। দ্রুত কেটে ঘরে তোলা প্রয়োজন। কিন্তু শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। যারা কাজ করতে আসছেন তারাও বেশিক্ষণ মাঠে থাকতে পারছেন না। তাপপ্রবাহে মানুষ, গবাদিপশু ও পাখি—সবাই ছায়া খুঁজছে।”
শুধু কৃষিখাত নয়, গরমের প্রভাব পড়েছে নিম্নআয়ের মানুষের জীবন-জীবিকাতেও। কালীগঞ্জের তুষভান্ডার বাজারের রিকশাচালক আছমত আলী বলেন, “প্রচণ্ড গরমে মানুষ প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হচ্ছে না। ফলে যাত্রীও কমে গেছে। আয় আগের তুলনায় অর্ধেকের বেশি কমে গেছে।”
রংপুর আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বুধবার সকালে রংপুরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত ছয় দিন ধরে তাপমাত্রা ৩৬ দশমিক ৬ থেকে ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। বৃষ্টিপাত না হওয়া এবং বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা বেশি থাকায় গরমের তীব্রতা আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, দ্রুত বৃষ্টিপাত না হলে তাপপ্রবাহের প্রভাব কৃষি উৎপাদন ও জনজীবনের ওপর আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে মাঠে এখনও ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ধান ও ভুট্টা রয়েছে। কৃষক ও শ্রমিকরা তাপপ্রবাহ উপেক্ষা করে ফসল কাটার কাজ চালিয়ে গেলেও তারা দীর্ঘ সময় মাঠে অবস্থান করতে পারছেন না।
তিনি কৃষক ও শ্রমিকদের দুপুরের প্রখর রোদ এড়িয়ে কাজ করা, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং প্রয়োজন ছাড়া দীর্ঘ সময় মাঠে না থাকার পরামর্শ দেন।
তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকলে কৃষিকাজ, শ্রমজীবী মানুষের আয় এবং সামগ্রিক জনজীবনে এর প্রভাব আরও বাড়তে পারে বলে
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আল আমিন খান , মোবাইলঃ ০১৩০৪৩৬৭৪৮১. ই-মেইলঃ dailycrimebangla@gmail.com