
নিজস্ব প্রতিবেদক:
সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অফলাইন বা কাগজভিত্তিক টেন্ডার প্রক্রিয়া আর গ্রহণযোগ্য হবে না। ওই দিন থেকে শতভাগ ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) ব্যবস্থার আওতায় পরিচালিত হবে সরকারি ক্রয় কার্যক্রম।
বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস. এম. মঈন উদ্দীন আহম্মেদ জানিয়েছেন, ১ জুলাইয়ের আগে যেসব টেন্ডার ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে শুরু হয়েছে, সেগুলো পূর্বনির্ধারিত নিয়মে শেষ করা যাবে। তবে ১ জুলাই ২০২৬-এর পর নতুন কোনো ম্যানুয়াল বা অফলাইন টেন্ডার অনুমোদন করা হবে না। একই সঙ্গে ই-জিপি ব্যবহার থেকে অব্যাহতি চেয়ে করা আবেদনও ৩০ জুনের পর আর গ্রহণ করা হবে না।
তিনি বলেন, “সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দক্ষতা এবং প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।”
দেশের অর্থনীতি ও সুশাসনের ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত। জাতীয় বাজেটের প্রায় ৪৫ শতাংশ এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) প্রায় ৮৫ শতাংশ ব্যয় হয় সরকারি ক্রয়ের মাধ্যমে। ফলে জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এই খাতে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করে, যা পরে জাতীয় সংসদে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) আইন, ২০২৬ হিসেবে পাস হয়। একইসঙ্গে পুরোনো পিপিআর-২০০৮ এর পরিবর্তে প্রবর্তন করা হয় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর), ২০২৫।
২০১১ সালে চালু হওয়া ই-জিপি ব্যবস্থার মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান, মূল্যায়ন, চুক্তি সম্পাদন, চুক্তি ব্যবস্থাপনা এবং অর্থ পরিশোধসহ পুরো ক্রয় প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা হয়েছে।
বিপিপিএর তথ্য অনুযায়ী, নতুন বিধিমালা কার্যকর হওয়ার পর সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়েছে।
দরপত্রে প্রতিযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে যেখানে প্রতিটি টেন্ডারে গড়ে ২.২ জন দরদাতা অংশ নিতেন, সেখানে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৪ জনে।
অন্যদিকে ই-জিপিতে নিবন্ধনের হারও বেড়েছে কয়েকগুণ। আগে প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০টি আবেদন জমা পড়লেও বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ৩০০টি আবেদন জমা পড়ছে।
নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণও বেড়েছে। বর্তমানে ই-জিপি প্ল্যাটফর্মে ৭ হাজার ৪০৮ জন নারী দরদাতা নিবন্ধিত রয়েছেন। এর মধ্যে নতুন বিধিমালা কার্যকর হওয়ার পর নিবন্ধিত হয়েছেন ১ হাজার ৪৭ জন নারী উদ্যোক্তা।
বিপিপিএ জানায়, নির্মাণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রাক্কলিত ব্যয় এবং দরপত্রের প্রস্তাবিত মূল্যের পার্থক্য কমে এসেছে। এতে অস্বাভাবিক কম মূল্যে কাজ পাওয়ার প্রবণতা হ্রাস পেয়েছে এবং বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ নিশ্চিত হচ্ছে।
ই-জিপি চালুর ফলে সরকারি ক্রয়ের গড় সময়ও কমে এসেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, ক্রয় কার্যক্রম সম্পন্ন করতে গড়ে ৫৪ দিন সময় লাগছে। একইসঙ্গে ৯৯ শতাংশ চুক্তি নির্ধারিত দরপত্র বৈধতার মেয়াদের মধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে।
বর্তমানে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি ও কার্যাদেশ সংক্রান্ত তথ্য শতভাগ অনলাইনে প্রকাশ করা হচ্ছে, যা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর), ২০২৫-এ মোট ১৫৪টি বিধি ও ২১টি তফসিল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নতুন বিধিমালার গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের মধ্যে রয়েছে—
তবে অগ্রগতির পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে বলে জানিয়েছে বিপিপিএ। সংস্থাটির মতে, ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ও দরদাতাদের দক্ষতার ঘাটতি, দুর্বল চুক্তি ব্যবস্থাপনা, নৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং পরিবর্তনের প্রতি অনীহা এখনও বড় প্রতিবন্ধকতা।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রশিক্ষণ, পর্যবেক্ষণ, নীতিগত সহায়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিপিপিএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস. এম. মঈন উদ্দীন আহম্মেদ বলেন, “জুলাই ২০২৬ থেকে শতভাগ ই-জিপি বাধ্যতামূলক হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ ডিজিটাল পাবলিক প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থায় এ অঞ্চলের অন্যতম অগ্রগামী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।”
তিনি আরও জানান, সরকারি ক্রয় ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে ‘ইনস্টিটিউট অব পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (আইপিপি)’কে ভবিষ্যতে একটি ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে সরকারি ক্রয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের জন্য আধুনিক ও সমন্বিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শতভাগ ই-জিপি বাস্তবায়ন কেবল একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়; বরং সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, ন্যায়সংগত প্রতিযোগিতা, জবাবদিহিতা এবং উন্নত নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এটি একটি যুগান্তকারী প্রশাসনিক সংস্কার।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আল আমিন খান , মোবাইলঃ ০১৩০৪৩৬৭৪৮১. ই-মেইলঃ dailycrimebangla@gmail.com