নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা:
খুলনা নগরীতে বিরল প্রজাতির একটি নিশাচর প্রাণীর সন্ধান পাওয়া গেছে। দেখতে অনেকটা কাঠবিড়ালির মতো হলেও প্রাণীটি আসলে কী—সুগার গ্লাইডার নাকি গন্ধগোকুল—তা নিয়ে চলছে আলোচনা ও অনুসন্ধান। প্রাণীটিকে উদ্ধার করে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২ জুন) নগরীর দক্ষিণ টুটপাড়া ২ নম্বর ক্রস রোড এলাকার একটি বাড়ির নারকেল গাছ থেকে প্রাণীটি নিচে পড়ে যায়। এ সময় একটি বিড়াল প্রাণীটির ওপর আক্রমণের চেষ্টা করলে স্থানীয় বাসিন্দা লাভলি বেগম সেটিকে উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ে রাখেন।
লাভলি বেগম ফটোসাংবাদিক এম এম মিন্টুর স্ত্রী। বর্তমানে প্রাণীটি তাদের বাসাতেই পরিচর্যায় রয়েছে। তাকে পানি, ভাত, আম, কাঁঠাল, কলাসহ বিভিন্ন ফলমূল খেতে দেওয়া হচ্ছে। প্রাণীটির বিষয়ে ইতোমধ্যে খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগকে অবহিত করা হয়েছে।
সাংবাদিক এম এম মিন্টু জানান, “প্রাণীটি গাছ থেকে পড়ে যাওয়ার পর একটি বিড়াল সেটির ওপর আক্রমণ করতে উদ্যত হয়েছিল। আমার স্ত্রী দ্রুত সেটিকে উদ্ধার করে ঘরে নিয়ে আসে। এরপর থেকে আমরা যত্নসহকারে খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছি। বন বিভাগকে খবর দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রাণীটিকে যথাযথভাবে পুনর্বাসন করা যায়।”
উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে প্রাণীটিকে একনজর দেখতে স্থানীয় মানুষের ভিড় জমে যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রাণীটির ছবি ছড়িয়ে পড়েছে এবং এর পরিচয় নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রাণীটি সুগার গ্লাইডার (Petaurus breviceps) অথবা গন্ধগোকুল (Asian Palm Civet) হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ ছাড়া নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
প্রাণীবিদদের মতে, সুগার গ্লাইডার একটি ছোট আকারের নিশাচর মাসুপিয়াল প্রাণী, যা মূলত অস্ট্রেলিয়া, নিউ গিনি ও ইন্দোনেশিয়ায় পাওয়া যায়। এদের সামনের ও পেছনের পায়ের মাঝখানে পাতলা চামড়ার পর্দা বা প্যাটাজিয়াম থাকে, যার সাহায্যে তারা এক গাছ থেকে অন্য গাছে প্রায় ৫০ মিটার পর্যন্ত ভেসে যেতে পারে। সামাজিক স্বভাবের এই প্রাণী দলবদ্ধভাবে বসবাস করে এবং গাছের রস, ফুলের মধু, পরাগ ও ছোট পোকামাকড় খেয়ে জীবনধারণ করে।
অন্যদিকে গন্ধগোকুল বা এশিয়ান পাম সিভেট দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পরিচিত একটি বন্যপ্রাণী। বিড়ালের মতো দেখতে হলেও এটি বিড়াল পরিবারের সদস্য নয়। শরীর থেকে বিশেষ ধরনের সুগন্ধ ছড়ানোর কারণে প্রাণীটি ‘পোলাও প্রাণী’ নামেও পরিচিত। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একে গাছখাটাশ, তালখাটাশ, নোঙর, সাইরেল বা ল্যাঞ্জা নামেও ডাকা হয়।
খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল বলেন, “প্রাণীটি গন্ধগোকুলও হতে পারে। তবে সরাসরি উদ্ধার করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরই সঠিক পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যাবে। আমাদের এলাকায় এ ধরনের প্রাণী বর্তমানে খুবই বিরল হয়ে পড়েছে।”
তিনি আরও জানান, উদ্ধারকৃত প্রাণীটি বন বিভাগের হেফাজতে নেওয়ার পর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ শেষে প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগরায়ণ, বনভূমি ধ্বংস এবং আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার কারণে অনেক বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে। ফলে বিরল প্রাণী সংরক্ষণে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বন বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা জরুরি।
খুলনায় উদ্ধার হওয়া রহস্যময় প্রাণীটির প্রকৃত পরিচয় জানতে এখন অপেক্ষা বন বিভাগের আনুষ্ঠানিক পর্যবেক্ষণ ও বিশেষজ্ঞ মতামতের।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আল আমিন খান , মোবাইলঃ ০১৩০৪৩৬৭৪৮১. ই-মেইলঃ dailycrimebangla@gmail.com