
ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ভারতের ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থাকে বুঝতে হলে কিছু মৌলিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। বিপান চন্দ্রের মতে, ভারত ও ব্রিটেনের মধ্যকার বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের কাঠামোটি ছিল এমন, যা ভারতকে ব্রিটেনের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল করে তুলেছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ভারত ব্রিটিশ উৎপাদক শ্রেণির জন্য একটি ধ্রুপদী উপনিবেশে পরিণত হয়, যেখানে ব্রিটিশরা নিজেদের পণ্যের বিশাল বাজার তৈরি করে নেয়।
দীর্ঘ সময় ধরে ভারতবর্ষকে ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে রাখার জন্য ব্রিটিশরা মূলত তিনটি প্রধান কৌশল অবলম্বন করেছিল। এর মধ্যে অন্যতম হলো নতুন কায়েমি স্বার্থ তৈরি করা এবং তার ভিত্তিতে একটি অনুগত দালাল শ্রেণি গড়ে তোলা। ১৬৬৫ সালের ‘এলাহাবাদ চুক্তি’র মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানি লাভের পর থেকেই বাংলা প্রদেশে ভূমিসংস্কারের নামে এক নতুন জমিদার শ্রেণি তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করে। এই প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য ছিল রাজস্ব আদায় বাড়িয়ে কোম্পানির মুনাফা নিশ্চিত করা।
কোম্পানির অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের চাপে বাংলা ও বিহারের প্রজারা চরম নিপীড়নের শিকার হন। একই সঙ্গে, কর প্রদানে ব্যর্থতার কারণে মুঘল আমলের পুরনো অভিজাত জমিদার গোষ্ঠী প্রায় বিলীন হয়ে যায়। তাদের জায়গা দখল করে নেয় ইংরেজ সরকারের অনুগত নতুন জমিদার শ্রেণি, যারা মূলত ব্যবসায়ী বা সরকারি আমলা হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৭৯৩ সালে গভর্নর জেনারেল চার্লস কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ে বাৎসরিক রাজস্ব প্রদানের ব্যবস্থা স্থায়ী রূপ দেন। এই বন্দোবস্তের ফলে একদিকে কোম্পানি তাদের করপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করে, অন্যদিকে কৃষি ব্যবস্থার পুঁজিতান্ত্রিক বিকাশের পরিবর্তে শুরু হয় জমিদারি ও মহাজনি শোষণ।
ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রভাবশালী শিক্ষাবিদ রাজনারায়ণ বসু তার ‘সেকাল আর একাল’ বক্তৃতায় এই পরাধীনতার অসহায় চিত্র তুলে ধরেন। তিনি আক্ষেপ করে উল্লেখ করেন যে, ইংরেজ রাজপুরুষেরা তাদের ন্যায্য আশা পূরণ করছেন না এবং দেশীয়দের প্রতি তাদের মমত্ববোধ অনেকাংশেই কমে গেছে। ঐতিহাসিক দলিল বিশ্লেষণ করলে এই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শোষণের নানা চিত্র বেরিয়ে আসে, যার উৎস নিচে দেওয়া হলো প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি-৮। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে, বিপান চন্দ্রের মতে, “এই দুটো বিপরীতমুখী প্রক্রিয়া, কারণ ও ফলাফলের দিক থেকে, ছিল পরস্পর নির্ভরশীল- ব্রিটেন ও ভারতের ভেতরকার বাণিজ্য, আর্থিক সংস্থান ও প্রযুক্তিসংক্রান্ত অর্থনৈতিক সম্পর্কের গোটা কাঠামোটি ব্রিটেনের ওপর ভারতের নিরন্তর ঔপনিবেশিক নির্ভরতা ও। 32. প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অবশেষে বহু বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের মুখে, বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে, ভারত ও পাকিস্তান নামে বিভক্ত হয়ে দুটো স্বাধীন দেশ তৈরি হওয়ার মাধ্যমে, ভারতবর্ষে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী শাসনের অবসান ঘটে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই দীর্ঘকাল ধরে ভারতবর্ষকে ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনস্থ রাখার জন্য, অপরাপর অঞ্চল ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির মতোই, তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকশ্রেণি যে তিনটি প্রধান কৌশল অবলম্বন করেছে, এবার আমরা একে একে সেগুলো আলোচনা করবো। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসন ১৬৬৫ সালে স্বাক্ষরিত ‘এলাহাবাদ চুক্তি’র অধীনে ‘দেওয়ানি’ লাভের পর, দিল্লিকে প্রদেয় নির্ধারিত পরিমাণ রাজস্বের অতিরিক্ত, যা কোম্পানির প্রাপ্য লভ্যাংশ হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে, তা আদায়ের জন্য বাংলা প্রদেশে, ভূমি সংস্কারের নামে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: উল্লেখ্য যে, মুঘল আমলেও এই অঞ্চলে জমিদারি ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল এবং সে ব্যবস্থার অধীনে দিল্লিতে অধিষ্ঠিত মুঘল সরকার ভূমিকে সাধারণভাবে ‘রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি’ হিসেবে বিবেচনা করতো এবং সেই ভূমিতে কর্ষণকারী প্রজাদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে ভূমি-রাজস্ব আদায়ের ভার। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এমতাবস্থায়, অতিরিক্ত রাজস্ব আয়ের জন্য অর্থলোলুপ কোম্পানি ও তার কর্মকর্তাদের অত্যাচারে বাংলা ও বিহারের প্রজাসাধারণ যেমন নানাভাবে নিপীড়নের শিকার হয়, তেমনি, কোম্পানিকে অতিরিক্ত কর প্রদানে ব্যর্থতার দায়ে, পুরনো ‘অভিজাত জমিদার গোষ্ঠী প্রায় বিলীন হয়ে যায়’, আর ‘ওই। 33. প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জমিদারদের অধিকাংশই ছিলেন স্থানীয় ভূমি-সংলগ্ন, কৃষকের সঙ্গে তাদের একটি জৈবিক সম্পর্ক ছিল; কিন্তু কোম্পানি-সৃষ্ট এই নতুন জমিদারদের সঙ্গে স্থানীয় ভূমি ও কৃষকের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল না- ‘রাজস্ব আদায়ের জন্য কোনো সুষ্ঠু ব্যবস্থা প্রবর্তনের ঝক্কি এড়ানোর জন্য। 34.
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আল আমিন খান , মোবাইলঃ ০১৩০৪৩৬৭৪৮১. ই-মেইলঃ dailycrimebangla@gmail.com