
জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন সুনিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চায় বাংলাদেশ বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, রাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্ষমতাহীন অবস্থায় রেখে কোনো দেশ প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী হতে পারে না। আঞ্চলিক বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোনো দেশ একা এগিয়ে যেতে পারে না। কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতা থেকেও পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও নির্ভরতার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে। শান্তি ও মানবিক বিশ্বের পক্ষে বাংলাদেশ।
বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বাংলায় নিজের প্রথম ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি দল, মত, ধর্ম কিংবা বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করাকেই রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন। কিন্তু প্রযুক্তির সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য এমন একটি শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ বাংলাদেশ নির্মাণ করা, যেখানে দেশের তরুণ প্রজন্ম তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসী জীবনযাপন করবে এবং প্রতিটি শিশু তাদের সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারবে। গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার, জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে উন্নয়নের মূল ভিত্তি হিসেবে তিনি তুলে ধরেন।
দেশের সামনে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধা গ্রহণ করে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশকে একটি প্রধান ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের উৎসাহিত করতে চলতি অর্থবছরে স্টার্টআপ খাতে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে সরকার শুধু ভোটের নয়, বরং অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন ঘটাতে চায় বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী হওয়ায় নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং উদ্যোক্তা সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নগদ সহায়তার পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি স্নাতক পর্যন্ত নারীদের বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে।
নিম্ন আয়ের ও প্রান্তিক মানুষের সহায়তায় ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং ই-হেলথ কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প চালু করার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, পরিবারের নারী প্রধানদের নামে ইস্যু করা ‘ফ্যামিলি কার্ড’ মূলত নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতীক। এই সেবাগুলোকে একত্র করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার দেশের ইতিহাসে এবার শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরে তা ক্রমান্বয়ে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার প্রসারে নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে এবং প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা মূল্যে দুপুরের খাবার, ব্যাগ ও স্কুল ইউনিফর্ম বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে দাঁড় করাতে পাঠ্যক্রমে স্পোর্টস যুক্ত করা হয়েছে, যার অংশ হিসেবে গত জুনে মাসব্যাপী ফুটবল টুর্নামেন্টে বিশ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেয়।
শহর ও গ্রামের মধ্যকার বৈষম্য হ্রাসে এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতে সরকারের নেওয়া ৩১ দফা কর্মসূচির সঙ্গে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ‘লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড’ নীতির ব্যাপক মিল রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এছাড়া প্রযুক্তি খাতের ডিজিটাল বিভাজন যেন ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিভাজনে রূপ না নেয়, সে বিষয়ে তিনি সতর্ক করেন এবং উন্নয়নশীল দেশের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার নিশ্চিতের আহ্বান জানান। জনগণের কাছে দেওয়া ৩১ দফা কর্মসূচির সঙ্গে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ‘লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড’ নীতির ৭৩ শতাংশ কার্যক্রমের সরাসরি এবং ২৭ শতাংশের পরোক্ষ মিল রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশ করছে। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভাজনে পরিণত হোক।’।
এলডিসি উত্তরণকে টেকসই করতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব জোরদারে বাংলাদেশ কাজ করছে। বৈশ্বিক সংঘাত নিরসনে কূটনীতি ও আলোচনার ওপর জোর দিয়ে তিনি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের দাবি সমর্থন করেন এবং মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে নিরাপদে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকা দাবি করেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় কপ-৩১ সম্মেলনে জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অর্থায়নের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, সৌরশক্তি বাড়ানো এবং ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের মতো পরিবেশবান্ধব কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নিয়মিত ও নিরাপদ অভিবাসনের পক্ষে জোর দিয়ে তিনি বিশ্বশান্তি রক্ষায় নিয়োজিত বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের ভূমিকা এবং বিশ্বমঞ্চে বহুপক্ষীয় সহযোগিতার প্রতি বাংলাদেশের অবিচল প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আল আমিন খান , মোবাইলঃ ০১৩০৪৩৬৭৪৮১. ই-মেইলঃ dailycrimebangla@gmail.com