
প্রখ্যাত কবি ও শিশু সাহিত্যিক আখতার হুসেনকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে শুক্রবার সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানুষের ঢল নামে। সকাল ১০টার দিকে তার মরদেহ শহীদ মিনারে আনা হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। শ্রদ্ধা নিবেদন করা সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, কেন্দ্রীয় খেলাঘর, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি এবং জাতীয় শিক্ষা-সংস্কৃতি আন্দোলন। শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় আখতার হুসেনের মরদেহ শহীদ মিনারে আনা হয়।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আখতার হুসেনের ছোট ছেলে প্রমিত হুসেন জানান, তার বাবা অত্যন্ত মানবিক মানুষ ছিলেন। তিনি মানুষের জন্য সবসময় ভালো চাইতেন, এমনকি অন্যের বিপদে নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতেন। প্রমিত জানান, অসুস্থ থাকা অবস্থায়ও তিনি সহকর্মী শিল্পীদের সংকটের কথা ভেবে কষ্ট পেতেন। অনেক শিল্পী যে চিকিৎসার অভাবে ধুঁকছেন, তা তাকে ভাবিয়ে তুলত। বাবার শেষ ইচ্ছার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিল্পীরা যাতে আর কোনো কষ্ট না পায়, সেই আহ্বান তিনি রেখে গেছেন। একদিন রাতে খালি গায়ে বাসায় ফেরার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পথে এক ছেলেকে কয়েকজন মারধর করে তার শার্ট ছিঁড়ে দিয়েছিল। অসুস্থতার সময় সহকর্মী শিল্পীদের দৈন্যদশা দেখে তিনি বেদনাতুর হয়েছিলেন। বাংলাদেশে অনেক শিল্পীর চিকিৎসা করার সামর্থ্যও নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার বাবা শেষবার বলে গিয়েছিলেন, ‘আর কোনো শিল্পী যেন এ কষ্টে না থাকে। সাহিত্য, রাজনীতি ও সংগীতে তার অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন একজন মানুষের প্রস্থান তাদের জন্য বেদনার।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা শহীদ মিনারে এসে তাকে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে আখ্যায়িত করেন। বেইলি রোড থেকে আসা তাসলিমা আকতার জানান, সাহিত্য, সংগীত ও রাজনীতির মেলবন্ধনে আখতার হুসেন তাদের কাছে এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। এছাড়া ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা রাজিব হাসান তাকে নিজের রাজনৈতিক গুরু হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে বা দ্বিধায় পড়লে আখতার ভাইয়ের পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা ছিল অমূল্য।
বিদায় অনুষ্ঠানের শেষভাগে জাতীয় সংগীত ও ছাত্র ইউনিয়নের দলীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আখতার হুসেনকে পুলিশ গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তার মরদেহ সিরাজগঞ্জের উদ্দেশে নেওয়া হয়, যেখানে তাকে স্ত্রীর কবরের পাশে সমাহিত করা হবে। উল্লেখ্য যে, বৃহস্পতিবার দুপুরে হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের জটিলতায় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ ও অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন।
ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা সাহিত্যে অবদান রাখা আখতার হুসেন শিশু-কিশোরদের জন্য শতাধিক বই লিখে গেছেন। শিশু একাডেমির পাঁচ খণ্ডের ‘শিশু-বিশ্বকোষ’-এর অন্যতম প্রধান লেখক ছিলেন তিনি। তার প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘সমুদ্র অনেক বড়’, ‘রামধনুকের সাঁকো’, ‘উল্টোপাল্টা’, ‘আমার দুটো ডানা’ এবং ‘খেলাঘরের পুতুলগুলো’। ছড়া ও শিশুতোষ মৌলিক গ্রন্থ, জীবনী, অনুবাদ ও সম্পাদিত গ্রন্থসহ তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা শতাধিক।
আখতার হুসেন কেবল লেখক হিসেবেই নয়, বরং সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবেও অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। তিনি উদীচীর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন এবং বহু নাটকের রচনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন। এছাড়া ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সংগীত এবং খেলাঘরের জনপ্রিয় সংগীতগুলো তারই লেখা। সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আল আমিন খান , মোবাইলঃ ০১৩০৪৩৬৭৪৮১. ই-মেইলঃ dailycrimebangla@gmail.com