
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ থেকে নতুন করে বড় অঙ্কের ঋণ সহায়তা পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। নতুন কর্মসূচির আওতায় সরকার ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের ঋণ পেতে আগ্রহী। তবে এই ঋণ প্রাপ্তির বিষয়টি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় পরীক্ষার মতো। এর জন্য মূলত চারটি কঠিন শর্ত বা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে বাংলাদেশকে। যার মধ্যে রয়েছে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের প্রয়োজনীয় সংস্কার, ভর্তুকি কমিয়ে তা যৌক্তিক পর্যায়ে আনা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। কারণ অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে একদিকে ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজন, অন্যদিকে পর্যাপ্ত রাজস্ব না থাকায় সেই ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা সীমিত। আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ হলে আগামী বছরের শুরুতে প্রথম কিস্তি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের সামনে এখন শুধু নতুন ঋণ পাওয়ার প্রশ্ন নয়।
আগামী ২৯ অক্টোবর আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সফরে আসছে। প্রায় দুই সপ্তাহের এই সফরে তারা বাংলাদেশের অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করবে। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে থাকবেন আইএমএফের উন্নয়ন সামষ্টিক অর্থনীতি বিভাগের প্রধান ক্রিস পাপাজিও। সফরে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ বিভাগ, এনবিআর, বিদ্যুৎ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সাথে তারা বৈঠক করবে। একই সাথে চলমান ঋণ কর্মসূচির পঞ্চম কিস্তি পর্যন্ত শর্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং ষষ্ঠ কিস্তি ছাড়ের বিষয়টিও পর্যালোচনার টেবিলে থাকবে। একই সঙ্গে আগের পাঁচ কিস্তির শর্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতিও যাচাই করা হবে। আর এই পরীক্ষায় বাংলাদেশের অগ্রগতির ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে নতুন ঋণ কর্মসূচির পথ কতটা সহজ হবে।
ওয়াশিংটনে আগামী ১৩ থেকে ১৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার প্রস্তুতি নিয়েছে। সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামষ্টিক অর্থনীতি বিভাগ ইতোমধ্যে এর প্রস্তুতি কার্যক্রম শুরু করেছে।
রাজস্ব আদায় বাড়ানো নতুন ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত অত্যন্ত কম, যা সরকারের বাজেট ঘাটতি ও ঋণের চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আইএমএফের মতে, রাজস্ব আয় বাড়াতে না পারলে সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয় বাড়ানো সম্ভব নয়। এনবিআরের প্রশাসনিক সংস্কার, করের আওতা বাড়ানো এবং রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আইএমএফের আলোচনায় প্রাধান্য পাবে।
ব্যাংক খাতের সংস্কারকে নতুন কর্মসূচির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ধরা হচ্ছে। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট এবং সুশাসনের অভাব ব্যাংক খাতকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। আইএমএফ এই খাতের পুনর্গঠনে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সমন্বিত কৌশলের তাগিদ দিচ্ছে। শুধুমাত্র সংস্কারের আশ্বাস নয়, বাস্তবে দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন ও খেলাপি ঋণ হ্রাসে কী অগ্রগতি হয়েছে, তা সংস্থাটি খতিয়ে দেখতে চায়। কারণ ব্যাংক খাত দুর্বল থাকলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। সংস্কারে গতি না এলে মধ্য মেয়াদে প্রবৃদ্ধি আরও কমে যাওয়ার ঝুঁকির কথাও বলা হয়েছে।
ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। আমদানি ব্যয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারি ভর্তুকি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম সমন্বয় করেছে। তবে নতুন কর্মসূচিতে জ্বালানি মূল্য ও ভর্তুকির যৌক্তিকীকরণের বিষয়গুলো বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে, যা পরোক্ষভাবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফেরানো চতুর্থ শর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সংকট এবং ধীর প্রবৃদ্ধি বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসার শঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং রিজার্ভ শক্তিশালী করার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে সরকারকে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন পাওয়ার বিষয়টিও সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। বাজেট সহায়তা ছাড়াও জলবায়ু মোকাবিলা, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য আমদানি এবং ব্যাংক খাতের সংস্কারে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ। ওয়াশিংটনের বার্ষিক সভায় সংস্থাটির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন এই ঋণ সাময়িকভাবে বাজেট ব্যবস্থাপনায় স্বস্তি দিতে পারলেও তা দিয়ে অর্থনীতির মৌলিক কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা সম্ভব নয়। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, নতুন ঋণের অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকা জরুরি।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, নতুন এই কর্মসূচি কাঠামোগত সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে। তার মতে, শুধু ঋণের জন্য নয়, দেশের নিজস্ব প্রয়োজনে রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব মিলিয়ে ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন ঋণচুক্তি চূড়ান্ত করার লক্ষ্য সরকারের। আর অক্টোবরের এই সফর নতুন কর্মসূচির পথে বাংলাদেশের প্রথম বড় পরীক্ষা হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আল আমিন খান , মোবাইলঃ ০১৩০৪৩৬৭৪৮১. ই-মেইলঃ dailycrimebangla@gmail.com