
চলতি বছরের রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন জাপানের বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই ও ফ্রান্সের বিজ্ঞানী হেনরি বি. কাগান। রাসায়নিক অণুর ‘মিরর ইমেজ’ বা দর্পণ প্রতিবিম্ব নিয়ে গবেষণা এবং অপ্রতিসম জৈব সংশ্লেষণে নন-লিনিয়ার ইফেক্ট ও অটোক্যাটালাইসিস আবিষ্কারের মাধ্যমে অসামান্য অবদান রাখায় তাদের এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। তাদের উদ্ভাবিত রাসায়নিক বিক্রিয়ার পদ্ধতি ওষুধশিল্পে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
রসায়ন নোবেল কমিটির প্রধান হাইনার লিংকে এক বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেন, কীভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হোমোকাইরালিটির উদ্ভব হয়, তা গত একশ বছর ধরে বিজ্ঞানের রহস্য ছিল। হেনরি কাগান ও কেনসো সোয়াই সেই জটিল রহস্যের সমাধান করেছেন। তাদের গবেষণায় এমন সব রাসায়নিক বিক্রিয়া নকশার পথ তৈরি হয়েছে, যা ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে অত্যন্ত জরুরি। একই রাসায়নিক উপাদান বা অণুর দুটি দর্পণ-রূপ মানবদেহে ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব ফেলতে পারে, তাই নির্দিষ্ট গঠন নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিছু রাসায়নিক অণুর দুটি রূপ থাকে, যেগুলো দেখতে পরস্পরের আয়না-ছবির মতো।
ফ্রান্সের ইউনিভার্সিটি প্যারিস-সুদের গবেষক হেনরি কাগান ১৯৮৬ সালে রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের একটি বিশেষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। এর ফলে একটি নির্দিষ্ট দর্পণ-রূপ অন্যটির তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে তৈরি করা সম্ভব হয়। পরবর্তী সময়ে জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সের বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই এই গবেষণায় আরও বড় অগ্রগতি নিয়ে আসেন। ১৯৯৫ সালে তিনি এমন একটি রাসায়নিক বিক্রিয়ার নকশা উপস্থাপন করেন, যা একই ধরনের দর্পণ-রূপ তৈরির পথ প্রশস্ত করে। সবশেষ ২০০৩ সালে তিনি এমন এক বিক্রিয়া প্রদর্শন করেন, যেখানে সম্ভাব্য দুটি দর্পণ-রূপের মধ্যে শুধু একটিই তৈরি হয়। নোবেল কমিটির মতে, জীবনের জৈবিক প্রক্রিয়ার বাইরে অন্য কোনো রাসায়নিক ব্যবস্থায় এমন ঘটনা আগে কখনও দেখা যায়নি।
ওষুধশিল্পে এই গবেষণার গুরুত্ব অপরিসীম। একটি অণুর নির্দিষ্ট গঠন শরীরে কাঙ্ক্ষিত প্রভাব তৈরি করতে পারলেও অন্যটি বিপরীত কাজ করতে পারে। কাগান ও সোয়াইয়ের উদ্ভাবন তাই নির্ভুল ওষুধ উৎপাদনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
উল্লেখ্য, ১৯০১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মোট ১১৭ বার রসায়নে নোবেল দেওয়া হয়েছে এবং মোট ১৯৮ জন ব্যক্তি এই সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যের ফ্রেডরিক স্যাঙ্গার ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যারি শার্পলেস দুবার করে নোবেল পেয়েছেন। গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে ‘মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্কস’ নিয়ে কাজ করার জন্য জাপানের সুসুম কিতাগাওয়া, অস্ট্রেলিয়ার রিচার্ড রবসন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওমর এম. ইয়াঘি যৌথভাবে রসায়নে নোবেল পেয়েছিলেন।
২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কারের ঘোষণা ৫ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানে যুক্তরাষ্ট্রের কার্ল ডেইসেরথ, জার্মানির পিটার হেগম্যান ও জর্জ নাগেল এবং পদার্থবিজ্ঞানে বেলজিয়ামের বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেনকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে তারা আলো-নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল ও অপটোজেনেটিকস আবিষ্কারের জন্য এবং পদার্থবিজ্ঞানে হালজেন উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্তকরণের জন্য এই স্বীকৃতি পেয়েছেন। মহাবিশ্বের দূরবর্তী স্থান থেকে পৃথিবীতে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্তকরণে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাঁকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
নোবেল পুরস্কারের অংশ হিসেবে বিজয়ীদের একটি ডিপ্লোমা, স্বর্ণপদক এবং প্রায় ১২ লাখ ডলারের অর্থমূল্য দেওয়া হয়। কোনো বিভাগে একাধিক বিজয়ী থাকলে সেই অর্থ তাদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হয়।
আসন্ন দিনগুলোতে সাহিত্যে ও শান্তিতে নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে এবং সবশেষে ১৩ অক্টোবর অর্থনীতিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হবে। মূলত আলফ্রেড নোবেলের উইল অনুযায়ী, মানবতার কল্যাণে অসামান্য অগ্রগতি সাধন করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ১৯০১ সাল থেকে এই সম্মাননা প্রদান করা হচ্ছে। পুরস্কারটি প্রতিষ্ঠাতা ও উদ্ভাবক আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছার ভিত্তিতে প্রদান করা হয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আল আমিন খান , মোবাইলঃ ০১৩০৪৩৬৭৪৮১. ই-মেইলঃ dailycrimebangla@gmail.com