
নিজস্ব প্রতিবেদক।।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসে। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট, দুর্ভিক্ষ, একদলীয় শাসনব্যবস্থা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সংঘাতের প্রেক্ষাপটে দিনটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা করে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল দেশের মানুষ। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক বিরোধের কারণে দেশ কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়ে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। এর পাশাপাশি রক্ষীবাহিনীর কর্মকাণ্ড এবং জাসদের সহিংস রাজনৈতিক তৎপরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে বলে ওই সময়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে আসে।
এমন এক সংকটময় পরিস্থিতিতে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতার সমীকরণে পরিবর্তন আসে। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে ওঠেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান, মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ এবং জাসদ নেতা কর্নেল আবু তাহের। ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান আবারও রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনের কেন্দ্রে চলে আসেন। অন্যদিকে খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল তাহেরের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ওই সময় দেশের মানুষ স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ঐক্য প্রত্যাশা করছিল। স্বাধীনতার ঘোষণার সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বের কারণে জিয়াউর রহমানের প্রতি জনসমর্থন ছিল। ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে সেই সমর্থন তাঁর রাজনৈতিক উত্থানকে ত্বরান্বিত করে।
পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, বেসরকারি উদ্যোগ, বিদেশি বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন সহযোগিতা সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেন। তাঁর শাসনামলে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কার্যক্রম বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়। ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের প্রসার এবং এনজিও খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টিও ওই সময়ের আর্থসামাজিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে আলোচিত হয়।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসে। বাকশাল ব্যবস্থার অবসানের পর আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজস্ব পরিচয়ে রাজনীতি করার সুযোগ ফিরে পায়। একই সময়ে জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও পুনরায় শুরু হয়। তবে এ সময়ের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও তার প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে বিতর্ক ও ভিন্নমত এখনো রয়েছে।
বিশ্বজুড়েও তখন সামরিক শাসন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার বিস্তার ঘটছিল। ব্রাজিল, চিলি, আর্জেন্টিনা, লিবিয়া, মিসর, সিরিয়া ও ইরাকসহ বিভিন্ন দেশে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল। এমন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখেন অনেকে।
জিয়াউর রহমানের সমর্থকদের মতে, তিনি রাজনৈতিক অস্থিরতা সামাল দিয়ে দেশকে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও বহুদলীয় রাজনীতির পথে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। অন্যদিকে সমালোচকদের দৃষ্টিতে, তাঁর শাসনামলের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও সামরিক শাসনের প্রেক্ষাপটও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সব মিলিয়ে ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমাত্রিক রাজনৈতিক অধ্যায়। দিনটি নিয়ে রাজনৈতিক দল, ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মূল্যায়ন থাকলেও স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক গতিপথে এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি।
সম্পাদনাগত নোট: মূল লেখায় থাকা রাজনৈতিক মূল্যায়নগুলোকে সরাসরি প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে না লিখে মতামত ও বিশ্লেষণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রকাশের আগে লেখকের নাম যুক্ত করা প্রয়োজন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আল আমিন খান , মোবাইলঃ ০১৩০৪৩৬৭৪৮১. ই-মেইলঃ dailycrimebangla@gmail.com