• মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪৬ অপরাহ্ন

গাজায় ধ্বংসস্তূপ সরাতে এক দশক, নিচে চাপা হাজারো মানুষ

রিপোর্টার: / ১৫ পঠিত
আপডেট: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

গাজা উপত্যকাজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ টনে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) হিসাবে, এই বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ অপসারণ করে এলাকাটিকে বসবাসের উপযোগী করে তুলতে অন্তত সাত থেকে ১০ বছর সময় লেগে যেতে পারে। এই উদ্ধার ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানে ব্যয় হতে পারে শত শত কোটি ডলার। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব ধ্বংসাবশেষের স্তূপের নিচে এখনো প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষের দেহ চাপা পড়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

গাজা সিটির তেল আল-হাওয়া এলাকার বৈরুত স্ট্রিট বর্তমানে ভয়াবহ পরিস্থিতির এক প্রতিচ্ছবি। একসময়ের কর্মচঞ্চল ও দোকানপাটে ঘেরা এই সড়কটি এখন প্রায় জনশূন্য। রাস্তার পাশে হেলে পড়া বহুতল ভবনগুলোতে এখনো ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন অনেক বাস্তুচ্যুত পরিবার। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে রাস্তায় নোংরা পানি জমে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রকৌশলী আহমেদ আলিয়ান তীব্র রোদ ও প্রতিকূলতার মধ্যে বৈরুত স্ট্রিটের একটি অংশ পরিষ্কারের দায়িত্ব পালন করছেন। কাজের বিশালতা দেখে তিনি হতাশা প্রকাশ করে জানান, মনে হচ্ছে চামচ হাতে পুরো সমুদ্র সেঁচে ফেলার নিষ্ফল চেষ্টা চলছে।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির ফিলিস্তিন বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি জ্যাকো সিলিয়ার্স জানিয়েছেন, গত ১৮ বছরে বিশ্বজুড়ে হওয়া বিভিন্ন যুদ্ধের সম্মিলিত ধ্বংসস্তূপের তুলনায় গাজার পরিমাণ প্রায় ২০ গুণ বেশি। এটি আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ এবং চ্যালেঞ্জিং ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার অভিযান। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মিলিতভাবে গাজার ৫৮০ কিলোমিটার সড়ক চলাচলের উপযোগী করেছে। এর মাধ্যমে ত্রাণবাহী ট্রাক ও উদ্ধারকারী দলের জন্য পথ তৈরি হলেও, এখন পর্যন্ত মাত্র ৯ লাখ ৭ হাজার টন ধ্বংসাবশেষ সরানো সম্ভব হয়েছে, যা মোট ধ্বংসস্তূপের দেড় শতাংশের চেয়েও কম। এখন পর্যন্ত প্রায় ৯ লাখ ৭ হাজার টন ধ্বংসস্তূপ সরানো হয়েছে এবং ৩ লাখ টনের বেশি পুনর্ব্যবহার বা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে। নতুন যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রী না পাওয়ায় ধ্বংসস্তূপ পুনর্ব্যবহারের দিকে ঝুঁকেছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি।

অভিযান পরিচালনায় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব। নিরাপত্তা শঙ্কার অজুহাতে খাদ্য ও ওষুধের বাইরে ভারী যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রীকে ‘দ্বৈত ব্যবহারের’ সামগ্রী হিসেবে চিহ্নিত করে গাজায় প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া বারবার হামলা ও নতুন করে ধ্বংসযজ্ঞের ফলে কিছু সড়ক একাধিকবার পরিষ্কার করতে হচ্ছে। জাতিসংঘের তথ্য মতে, বর্তমান পরিস্থিতির কারণে গাজার মাত্র ৩০ শতাংশ এলাকায় ত্রাণকর্মীদের প্রবেশাধিকার রয়েছে, যা উদ্ধারকাজকে ধীরগতির করে তুলেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির সময় নির্ধারিত ‘ইয়েলো লাইন’ ঘিরে প্রবেশাধিকারও সীমিত রয়েছে। গাজার মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকায় মানুষ ও ত্রাণকর্মীদের প্রবেশ সম্ভব হচ্ছে বলে দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নতুন যন্ত্রপাতির অভাবে ইউএনডিপি গাজাজুড়ে পাঁচটি কেন্দ্র স্থাপন করে ধ্বংসস্তূপ থেকে লোহা ও রড আলাদা করার এবং কংক্রিট গুঁড়ো করে তা রাস্তা মেরামতের কাজে ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে। স্থানীয় প্রকৌশলীদের সহায়তায় পুরোনো মেশিনগুলো সচল রাখার চেষ্টা চলছে, তবে খুচরা যন্ত্রাংশ ও ইঞ্জিনের তেলের সংকটে এই প্রক্রিয়া প্রায়ই বিঘ্নিত হয়। প্রকৌশলী নেহাল আবু হাসান জানিয়েছেন, পুনর্ব্যবহৃত এই উপাদানের মান খুব একটা ভালো না হলেও, বিকল্পহীন পরিস্থিতিতে গর্ত ভরাট কিংবা তাঁবুর নিচে বিছানোর কাজে এগুলোই ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে দুটি স্থানীয় প্রকৌশলীরা মেরামত করে আবার সচল করেছেন। পরে কংক্রিট ভেঙে ছোট টুকরোয় পরিণত করা হয়।

ধ্বংসস্তূপ অপসারণের পর সামান্য হলেও ইতিবাচক পরিবর্তনের ছোঁয়া পেয়েছেন স্থানীয়রা। জাবালিয়া থেকে তেল আল-হাওয়ায় আশ্রয় নেওয়া ইব্রাহিম দারাদোনা জানিয়েছেন, ধ্বংসাবশেষ সরানোর ফলে পোকামাকড় ও ইঁদুরের উপদ্রব কমায় পরিবেশ কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। কিছু ব্যবসায়ী ধ্বংসস্তূপ সরানোর ২০ দিনের মধ্যেই দোকান খুলতে শুরু করেছেন। তবে এই ইট-পাথরের স্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে অনেক পরিবারের প্রিয়জনের স্মৃতি ও মরদেহ। তাই উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের সহায়তায় ফরেনসিক পরীক্ষা ও ধর্মীয় মর্যাদায় দাফনের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সংকট। এতে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ আরও জটিল হয়ে পড়েছে।

উদ্ধারকাজে ধ্বংসস্তূপের নিচে লুকিয়ে থাকা অবিস্ফোরিত বোমা ও গোলাবারুদ বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। এছাড়া দুর্বল ভবনগুলোর কাঠামোগত ধস ও অ্যাসবেস্টসের মতো ক্ষতিকারক উপাদানের উপস্থিতিও বড় বিপদ। জাতিসংঘের মাইন অ্যাকশন সার্ভিস ও ব্রিটিশ সংস্থা হ্যালো ট্রাস্টের মতো অংশীদাররা এলাকা চিহ্নিত করার কাজে সহায়তা করলেও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতায় গতি ধীর। সব মিলিয়ে, ধ্বংসস্তূপ সরানো কেবল পুনর্গঠনের শর্ত নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের চলাচল ও মৌলিক সেবা পুনরায় চালুর জন্য একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ