
রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে শনিবার তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’-এর উদ্বোধন হয়েছে। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক সংলাপে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি জানান, দেশকে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ইতিবাচক পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছে। এর মাধ্যমে তিনি নীতিগত নিশ্চয়তা ও দীর্ঘমেয়াদী নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। সরকার উৎপাদন, সেবা এবং রপ্তানি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে চায়। সরকার এখন প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, জনগণের ম্যান্ডেট রক্ষায় সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা রয়েছে, যার মূল লক্ষ্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী শক্তিশালী করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘কৃষক কার্ড’ এবং ‘হেলথ কার্ড’-এর মতো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে একটি সমন্বিত ‘ইউনিভার্সেল কার্ড’-এ রূপান্তর করা হবে। একইসঙ্গে স্বাস্থ্যখাতে এক লাখ কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যার ৮০ শতাংশই নারী। তাদের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া হবে। স্বাস্থ্য খাতে এক লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগের উদ্যোগের কথা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, তাদের প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হবেন। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি জোরদার করা হচ্ছে।
শিক্ষা ও কৃষিখাতের আধুনিকায়নে সরকারের কৌশলের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসারের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে। কৃষিখাতে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থায়ন, বাজার সংযোগ স্থাপন এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খনন, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়ন ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে। পরিবেশ রক্ষায় ২৫ কোটি গাছ লাগানো এবং সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধিতেও সরকার বদ্ধপরিকর। প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে তরুণদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও স্টার্টআপে সহায়তা করা হবে। মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি আইনের শাসন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর করা হবে।
রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক ও আর্থিক সমর্থনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে। মিয়ানমারেই যেহেতু এই সংকটের উৎপত্তি, তাই স্থায়ী সমাধান সেখানেই হতে হবে। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অবশ্যই নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই হতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রী জানান, সমুদ্রবন্দর ও উপকূলীয় অর্থনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশের বিশ্ব অর্থনীতির সাথে যুক্ত হওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। বাণিজ্য, জ্বালানি ও জলবায়ুসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিন দিনব্যাপী এই কনভারসেশনে শতাধিক দেশের দুই শতাধিক আলোচক, তিন শতাধিক ডেলিগেট ও এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী যোগ দিয়েছেন। ‘ফ্র্যাগমেন্টস, ফ্রন্টিয়ার্স, ফিউচারস: নেভিগেটিং পাওয়ার, টেকনোলজি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন এ ওয়ার্ল্ড রিরিটেন’ প্রতিপাদ্য নিয়ে এই আয়োজন ৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। জাহাজ চলাচল, মৎস্য, পর্যটন, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।