• বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫১ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
২৯ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচন: তপশিল ঘোষণা হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন সাবমেরিন ড্রোন আটকের দাবি ইরানের, পেন্টাগনের ভিন্ন ব্যাখ্যা প্রেক্ষাপট: সুপ্রিম কোর্টকে দুর্নীতিমুক্ত করতে প্রধান বিচারপতিকে এক মাসের আল্টিমেটাম দোহায় ইসরায়েলি হামলার এক বছর: মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতি ও সার্বভৌমত্বের নতুন সংকট আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগের মুখে ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালকের পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ শাহজালাল বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তনের পরিকল্পনা নেই: বিমানমন্ত্রী মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সামাজিক সচেতনতা ও সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান লস অ্যাঞ্জেলেসে বর্ণিল আয়োজনে সম্পন্ন হলো ফোবানার ৪০তম সম্মেলন নেপালে বন্যায় নিখোঁজ ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটার চিকিৎসক ও তার পরিবার জর্ডানে মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলা: ক্ষতিগ্রস্ত একাধিক যুদ্ধবিমান

দোহায় ইসরায়েলি হামলার এক বছর: মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতি ও সার্বভৌমত্বের নতুন সংকট

রিপোর্টার: / ৩ পঠিত
আপডেট: বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর বিকাল ৩টা বেজে ৪৬ মিনিট। এই সময়টি কেবল কাতারের ইতিহাসে নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিপজ্জনক মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। যুদ্ধবিরতি আলোচনার জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যেই দোহা শহরের একটি আবাসিক ভবনে ইসরায়েলি বিমান হামলা চালানো হয়, যেখানে হামাসের প্রতিনিধিদল অবস্থান করছিল। শান্তির দূত হিসেবে পরিচিত দোহায় এই আকস্মিক সামরিক পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়।

এই নৃশংস হামলায় ঘটনাস্থলে কর্তব্যরত অবস্থায় প্রাণ হারান ২২ বছর বয়সি কাতার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর (লখুইয়া) সদস্য বদর সাদ মোহাম্মদ আল-হুমাইদি আল-দোসারিসহ বেশ কয়েকজন। এছাড়া হামলায় আরও অনেক নিরাপত্তাকর্মী ও সাধারণ নাগরিক আহত হন। হামলার এক বছর পূর্তিতে বিষয়টি কেবল স্মরণের উপলক্ষ নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নৈতিকতার এক বড় পরীক্ষার মুহূর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইসরায়েলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, তাদের লক্ষ্য ছিল হামাস, কাতার নয়। তবে এই কৌশলগত যুক্তিটি ঘটনার ভয়াবহতাকে আড়াল করতে পারেনি। কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে শত্রুর উপস্থিতির অজুহাতে অন্য কোনো দেশের ওপর সামরিক শক্তি প্রয়োগের কোনো বৈধতা থাকতে পারে না। কাতার যাদের আশ্রয় দিয়েছিল, তারা কোনো সাধারণ স্থানে আত্মগোপনকারী ছিলেন না; বরং তারা ছিলেন একটি স্বীকৃত রাজনৈতিক আলোচনার প্রক্রিয়ার অংশ। ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও হামাসের মতো পক্ষগুলোর মধ্যে যোগাযোগের স্বার্থেই দোহা এই পরিসর তৈরি করেছিল, কারণ সরাসরি কথা বলতে না পারা পক্ষগুলোর জন্য একজন বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন ছিল।

এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতির তিনটি মৌলিক ভিত্তিকে আঘাত করেছে: সার্বভৌমত্বের সীমানা, মধ্যস্থতাকারীদের রাজনৈতিক সুরক্ষা এবং আলোচনার টেবিলকে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিধি থেকে আলাদা রাখা। মধ্যস্থতার মূল শর্তই হলো—প্রতিপক্ষরা একে অপরকে যতই অপছন্দ করুক, মধ্যস্থতাকারীর ভূখণ্ড ও পরিসরটি সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকতে হবে। আলোচনার আয়োজক দেশেই যদি মধ্যস্থতাকারীদের ওপর হামলা চালানো হয়, তবে যেকোনো ধরনের মধ্যস্থতা কেবল শারীরিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণই নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে অর্থহীন হয়ে পড়ে।

ইসরায়েলি নীতির এই স্ববিরোধিতা আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে কাতারকে হামাসের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখার জন্য চাপের মুখে পড়তে হতো, অন্যদিকে সেই একই যোগাযোগ মাধ্যমকে জিম্মি মুক্তি ও যুদ্ধবিরতি চুক্তির মতো মানবিক কাজে ব্যবহার করা হতো। যখন কোনো পক্ষ নিজেদের স্বার্থে মধ্যস্থতাকে অপরিহার্য মনে করে, আবার পরিস্থিতি প্রতিকূল হলে সেই মাধ্যমকেই অবৈধ ঘোষণা করে, তখন সেই কূটনীতিতে নৈতিকতার অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও মানবাধিকার কমিশন এই হামলার নিন্দা জানিয়ে কাতারের সার্বভৌমত্বের পক্ষে অবস্থান নিলেও, বড় শক্তিগুলোর ভূমিকা ছিল কেবল কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। এটি প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় মধ্যস্থতাকারীদের আইনি ও রাজনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। ছোট বা মাঝারি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব যদি বড় শক্তির সামরিক ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

হামলার পরও কাতার মধ্যস্থতার ভূমিকা থেকে সরে দাঁড়ায়নি। দোহা তার মার্কিন, মিশরীয় এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে কাজ চালিয়ে গেছে। এর ফলস্বরূপ, ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির কূটনৈতিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতেও কাতারকেই ফিরে আসতে হয়েছিল। এটি প্রমাণ করে যে, সহিংসতা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক নিয়ম নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। যারা শান্তি ও আলোচনা চান, তাদের মনে রাখা জরুরি যে আলোচনার টেবিল নিজেই কখনো সামরিক লক্ষ্যবস্তু হতে পারে না।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ