উপশিরোনাম:
নারীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো ও জীবিকা সুরক্ষায় হাজার কোটি টাকার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে সরকার
নিজস্ব প্রতিবেদক:
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় নারীদের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে অভিযোজন কৌশল বাস্তবায়ন করছে সরকার। বিশেষ করে উপকূলীয় ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের নারীদের সহনশীলতা বৃদ্ধি, জীবিকা সুরক্ষা এবং নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে জলবায়ু-সংবেদনশীল কর্মসূচি ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপকূলীয় ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাই জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রমে নারীদের বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
তাদের মতে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং শ্রমের লিঙ্গভিত্তিক বিভাজনের কারণে দুর্যোগের সময় ও পরবর্তী সময়ে নারীদের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব ও চাপ সৃষ্টি হয়। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সরকার নারী-কেন্দ্রিক অভিযোজন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জলবায়ু বাজেটে ‘জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন ও অভিযোজনে নারীর সক্ষমতা বৃদ্ধি’ কর্মসূচির জন্য ৬ হাজার ৮৮৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই অর্থের মাধ্যমে জলবায়ুজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, জীবিকা উন্নয়ন এবং অভিযোজন সক্ষমতা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের জন্য বিশেষ অভিযোজন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে নারীদের পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া, জীবিকা সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার মতো লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকায় সরকার জলবায়ু-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করছে। এর অংশ হিসেবে ব্রি ধান-৬৭ চাষে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে, যাতে লবণাক্ততার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিকাজ পুনরুজ্জীবিত হয় এবং গ্রামীণ নারীরা খাদ্য উৎপাদন ও পারিবারিক আয় বাড়ানোর সুযোগ পান।
জলবায়ু অভিযোজনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে সরকার ২২ হাজার ১৬৪ কোটি ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এই অর্থ প্রত্যন্ত অঞ্চলে নারীবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় করা হবে।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নির্মিত ও সংস্কার করা ঘূর্ণিঝড় এবং দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্রে নারীদের জন্য পৃথক স্যানিটেশন ব্যবস্থা, ওয়াশ ব্লক এবং নিরাপদ স্থান নিশ্চিত করা হচ্ছে, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে তাদের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও মর্যাদা বজায় থাকে।
এছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগ দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ সুপেয় পানির ব্যবস্থা ও পৃথক শৌচাগার নির্মাণ করছে। এর ফলে শিক্ষার পরিবেশ উন্নত হওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার পাশাপাশি নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। গ্রামীণ হাট-বাজারে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পৃথক বিপণন এলাকা গড়ে তোলা হচ্ছে, যাতে তারা নিরাপদ পরিবেশে ব্যবসা পরিচালনা করে পারিবারিক আয় বৃদ্ধি করতে পারেন।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জলবায়ু বাজেট প্রতিবেদনের ভূমিকায় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে জলবায়ু ঝুঁকি এবং টেকসই উন্নয়ন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাই জলবায়ু-সহনশীল ও জলবায়ু-সংবেদনশীল উন্নয়ন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
তিনি বলেন, নতুন বাজেটের অন্যতম কৌশলগত অগ্রাধিকার হলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ, টেকসই, জলবায়ু-সহনশীল ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, সরকার এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে কাজ করছে, যা হবে প্রতিযোগিতামূলক, উৎপাদনশীল, ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মর্যাদাপূর্ণ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সহনশীল অবকাঠামো, জীবিকা উন্নয়ন এবং নারীর ক্ষমতায়নকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জলবায়ু-সহনশীল ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।