
নিজস্ব প্রতিবেদক: কৃষিতে ব্যবহৃত উচ্চঝুঁকির বালাইনাশক নিয়ে দেশে বাড়ছে উদ্বেগ। বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ এসব রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার শুধু মাটি, পানি ও পরিবেশ দূষণ করছে না, দীর্ঘমেয়াদে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। ক্যানসার, কিডনি রোগ ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি গর্ভস্থ শিশুর ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে উচ্চঝুঁকির অন্তত ১৭টি বালাইনাশক এখনো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব বালাইনাশক ১ হাজার ৭৪১টি ব্র্যান্ড নামে নিবন্ধিত হয়ে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। যদিও ১৯৬০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশে মোট ১৯টি বালাইনাশক নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তারপরও ঝুঁকিপূর্ণ অন্য পণ্যগুলোর ব্যবহার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশে বালাইনাশকের ব্যবহার শুরু হয় ১৯৫০-এর দশকে। ১৯৫৬ সালে যেখানে মাত্র ৩ মেট্রিক টন বালাইনাশক আমদানি করা হয়েছিল, সেখানে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আমদানির পরিমাণ ৪০ হাজার টন ছাড়িয়ে গেছে।
বর্তমানে দেশে ৩২৭টি মলিকিউল বা ভ্যারিয়েন্টের বালাইনাশক ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব পণ্য ৭ হাজার ৪০৫টি ব্র্যান্ড নামে নিবন্ধিত। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং এসব বালাইনাশকের নিবন্ধন দিয়ে থাকে।
তবে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে প্যারাকোয়াট ও গ্লাইফোসেটের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পুনঃনিবন্ধন ও নতুন নিবন্ধন বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু যেসব ব্র্যান্ডের নিবন্ধনের মেয়াদ এখনো রয়েছে, সেগুলো বাজারে বিক্রি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
প্যারাকোয়াট ও গ্লাইফোসেটের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ আরও ১৫টি বালাইনাশকের ব্যবহার বন্ধে এখনো কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ফলে কৃষিতে এসব রাসায়নিকের ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে উচ্চঝুঁকির বালাইনাশকের সংস্পর্শে থাকা কৃষক, শ্রমিক এবং ভোক্তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে এসব রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্রের দাবি, দেশে আমদানি করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বালাইনাশকের নমুনা পরীক্ষায় মাত্রাতিরিক্ত ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ল্যাবরেটরিতে ২০১৯ সালে পরিচালিত পরীক্ষায় এ ধরনের বিষয় উঠে আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বালাইনাশকের মাধ্যমে মাটি, পানি ও পরিবেশ দূষিত হলে কৃষিপণ্যেও ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি তৈরি হতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় কৃষিপণ্য ও মানবদেহে সীসাসহ বিভিন্ন ভারী ধাতুর উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার বিষয়টিও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
পরীক্ষার পর আমদানি করা বালাইনাশকের গুণগত মান যাচাইয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, ব্যবসায়ীদের চাপের কারণে বিষয়টি ছয় মাস স্থগিত রাখার সুপারিশ করা হলেও পরবর্তীতে কার্যকর উদ্যোগ আর এগোয়নি।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ল্যাবে ২০১৬ সাল থেকে ফল, সবজি, পান, শুঁটকি মাছসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যে বালাইনাশকের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গত পাঁচ বছরের পরীক্ষায় প্রায় ১০ শতাংশ সবজি, ৪ শতাংশ ফল এবং পান ও শুঁটকি মাছে বিপজ্জনক মাত্রায় বালাইনাশকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে।
তবে দেশে ৩২৭টি কেমিক্যাল পেস্টিসাইড মলিকিউল ব্যবহৃত হলেও সংশ্লিষ্ট ল্যাবের ৭০টির বেশি মলিকিউল পরীক্ষা করার সক্ষমতা নেই। কারিগরি দক্ষ জনবল ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের ঘাটতিকেই এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
বালাইনাশক কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির ৭৩তম সভায় দুটি বালাইনাশকের নতুন নিবন্ধন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বিধিমালা প্রণয়ন, নিয়মিত পিটাক সভা আয়োজন, বিপজ্জনক বালাইনাশক বাজার থেকে প্রত্যাহার, খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন, বন্দরে বালাইনাশক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরির মতো বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিপজ্জনক বালাইনাশকের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে পর্যায়ক্রমে সেগুলো বাজার থেকে প্রত্যাহারের কথাও বলা হয়েছিল। তবে কখন এবং কীভাবে এসব পণ্য প্রত্যাহার করা হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা না থাকায় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বালাইনাশকের বাজারে প্রভাবশালী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। ক্ষতিকর পণ্য দ্রুত নিষিদ্ধ হলে ব্যবসায়িক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এমনকি ব্যবসায়ীদের চাপের কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পিটাক সভায় আলোচনাতেও আসে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। আবার কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে তা বাস্তবায়নে নানা জটিলতা তৈরি হয়।
৯০তম পিটাক সভায় কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ আমদানি করা বালাইনাশক দেশে প্রবেশের আগে বন্দরে গুণগত মান পরীক্ষা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, কোনো বালাইনাশকে ভেজাল বা ক্ষতিকর ভারী ধাতু রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
তবে কৃষি বিভাগ বলছে, এ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক ল্যাবরেটরি ও অবকাঠামো এখনো দেশে পর্যাপ্তভাবে তৈরি হয়নি।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান ও পিটাকের সভাপতি ড. মো. আবদুছ ছালাম জানান, জাতীয় জীববৈচিত্র্য কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে ২৫ শতাংশ বিপজ্জনক বালাইনাশক ধাপে ধাপে কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় শুধু দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ নয়, উচ্চঝুঁকির বালাইনাশকের আমদানি, নিবন্ধন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সার্বিকভাবে, কৃষি উৎপাদন বাড়াতে বালাইনাশকের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হলেও উচ্চঝুঁকির রাসায়নিকের অবাধ ব্যবহার জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা ও পরিবেশের জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করতে পারে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ বালাইনাশক শনাক্ত করে পর্যায়ক্রমে বাজার থেকে প্রত্যাহার, বন্দরে কঠোর মান পরীক্ষা এবং আধুনিক পরীক্ষাগার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।