
নিত্যপণ্যের বাজারে সবজির পর এবার ডিমের দামেও আগুন লেগেছে। আমিষের চাহিদা মেটাতে নিম্ন আয়ের মানুষ মূলত ডিমের ওপরই ভরসা করেন, কিন্তু বর্তমানে এই পণ্যের দামও সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন তাঁরা। রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে ফার্মের ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায়। পাড়া-মহল্লার ছোট দোকানগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ; সেখানে এক হালি ডিমের দাম রাখা হচ্ছে ৫৫ টাকা, যার অর্থ দাঁড়াচ্ছে প্রতি ডজন ডিমের জন্য গ্রাহককে গুনতে হচ্ছে ১৬৫ টাকা।
তেজগাঁওয়ের পূর্ব নাখালপাড়া সমিতি বাজারে শনিবার সকালে ডিম কিনতে আসা আলেয়া বেগম আক্ষেপ করে জানান, সবজির দামের চাপে এমনিতেই সংসার চালানো কঠিন, তার ওপর ডিমের এই বাড়তি দাম বাড়তি সংকট তৈরি করেছে। তাঁর স্বামী একটি ওয়ার্কশপে দৈনিক ৬০০ টাকা মজুরিতে রংমিস্ত্রির কাজ করেন। পরিবারের আয়ের এই সীমিত উৎস দিয়ে মাছ-মাংসের বদলে এখন ডিম ও সবজিই তাঁদের প্রধান খাবার। অথচ এখন ডিম কিনতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের।
বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, চার মাস আগে ডিমের ডজন ১০০ থেকে ১১০ টাকায় নেমে এলেও এরপর থেকে তা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বর্তমানে কারওয়ান বাজার বা নাখালপাড়ার মতো এলাকায় সাদা ডিমের ডজন ১৪০-১৪৫ টাকা এবং বাদামি ডিম ১৪৫-১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে ডিমের দাম ৩ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে।
চট্টগ্রামের চিত্রও প্রায় একই। সেখানে গত এক সপ্তাহে ডিমের দাম ডজনপ্রতি ১৪০-১৪৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০-১৬৫ টাকায় ঠেকেছে। বহদ্দারহাটের পাইকারি ব্যবসায়ী আহমেদ ফারুক জানান, কিছু সময় দাম স্থিতিশীল থাকলেও বৃষ্টির পরপরই তা ফের বাড়তে শুরু করে। এছাড়া বন্দরনগরীর আগ্রাবাদসংলগ্ন চৌমুহনী বাজারেও একই ধরনের মূল্যবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, চট্টগ্রামের বাজারে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ লাখ ডিমের চাহিদা রয়েছে, যার সিংহভাগই বাইরে থেকে সরবরাহ করা হয়।
সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজিকে দুষছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন। তিনি অভিযোগ করেন, বাজার তদারকির অভাব এবং অতিমুনাফার প্রবণতায় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে ডিম। ২০২৪ সালে যখন ডিমের ডজন ১৬০ টাকা ছাড়িয়েছিল, তখন দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল। সেই সময় সরকার দাম বেঁধে দিলেও বর্তমানে পরিস্থিতি তার চেয়েও নাজুক হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
ব্যবসায়ীদের একাংশের মতে, টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় ডিম আসলেও এর দাম অনেকটা কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে সারা দেশে অভিন্ন উচ্চমূল্য নির্ধারণ করে দিচ্ছেন। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পাইকাররা পরিকল্পিতভাবে দু-তিন দিন পর পর দাম বাড়িয়ে বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখছেন।
ডিম উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পেছনে প্রাকৃতিক কারণও রয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত জুলাইয়ের ভয়াবহ বন্যায় ছয় হাজারের বেশি হাঁস-মুরগির খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ডিম উৎপাদনকারী লেয়ার খামারও রয়েছে। ফলে স্থানীয়ভাবে ডিমের সরবরাহ স্বাভাবিকের তুলনায় কমে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে বাজারে।
তবে বিষয়টিকে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ হিসেবে দেখতে নারাজ সংশ্লিষ্টরা। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিচালক আতিয়া সুলতানা জানিয়েছেন, বাজার তদারকি নিয়মিত করা হচ্ছে এবং ডিমের দাম বাড়ার পেছনে কোনো অসাধু কারসাজি রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গত বছর ডিমের দাম অস্বাভাবিক বাড়লে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রতিটি ডিমের দাম ১১ টাকা ৮৭ পয়সা অর্থাৎ ডজন ১৪২ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছিল, কিন্তু বর্তমানে সেই নির্দেশনা অনেকটা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সে হিসাবে ডজনের দাম দাঁড়ায় ১৬৫ টাকা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মাছ-মাংস কেনার সামর্থ্য না থাকায় ডিম ও সবজি দিয়েই কোনো রকমে সংসার চালাতে হচ্ছে তাঁদের। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাজার তদারকির ঘাটতির সুযোগে ভোক্তাদের হয়রানি করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গরিবের পাত থেকে ডিম কেড়ে নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।