
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আনা গণহত্যার অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি এই অভিযোগকে ‘শতাব্দীর সেরা মিথ্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে তিনি তার বিরুদ্ধে তোলা সব ধরনের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে বলেন, ইসরায়েল গণহত্যা চালায়নি, বরং তা প্রতিরোধ করেছে। তারা গাজা থেকে বন্দিদের ফিরিয়ে আনতে একসঙ্গে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি ইসরায়েলের জনগণের সাহসিকতাকে স্যালুট জানাই। আমি আমাদের বীর সেনাদের সাহসিকতাকে স্যালুট জানাই—তারা ইহুদি, মুসলিম, খ্রিস্টান, দ্রুজ।
বক্তব্যের শুরুতেই নেতানিয়াহু ‘বর্বরদের’ বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাহসী নেতৃত্ব এবং দুই দেশের পারস্পরিক অংশীদারত্বের প্রশংসা করে তাকে ধন্যবাদ জানান। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে সভ্যতা রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। গত বছর মার্কিন মধ্যস্থতায় সম্পন্ন একটি চুক্তির মাধ্যমে গাজায় বন্দি থাকা জীবিত ও মৃত সকল বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার ঘটনাকেও তিনি একটি বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে “সভ্যতাকে রক্ষা করার” জন্য কাজ করেছে। সংকটময় মুহূর্তে ইতিহাসের শিক্ষা, অভিন্ন মূল্যবোধ এবং সাহসের জোরে ইসরায়েলিরা একসূত্রে গেঁথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ায়।
নেতানিয়াহু ইসরায়েলের আভ্যন্তরীণ সংহতির ওপর জোর দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে ইসরায়েলের সব নাগরিক একই ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করছে। এ সময় তিনি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, এমন একটি ক্ষেপণাস্ত্র যদি জাতিসংঘের সদর দপ্তরে আঘাত করে, তবে পুরো এলাকা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। তিনি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে বিশ্বের অন্যতম নৈতিক বাহিনী হিসেবে দাবি করেন। তার মতে, ‘ইসরায়েল হলো “একই ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করা একটি জাতি—তা সে বামপন্থী বা ডানপন্থী, তরুণ বা প্রবীণ, ধর্মীয় কিংবা ধর্মনিরপেক্ষ যে-ই হোক না কেন।
ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি ইসরায়েলের যুদ্ধের ‘অষ্টম ফ্রন্ট’ হিসেবে কাতার ও তুরস্ককে চিহ্নিত করে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, কাতার হামাস নেতাদের আশ্রয় দিয়ে আসছে এবং আল জাজিরার মতো গণমাধ্যম ও মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অর্থায়নের মাধ্যমে ইসরায়েলবিরোধী মিথ্যা প্রচারণা চালাচ্ছে। নেতানিয়াহুর দাবি, এর ফলে পশ্চিমা বিশ্বের তরুণ প্রজন্মের মগজধোলাই করা হচ্ছে। ইসরায়েলের প্রতি বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা সমালোচনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কাতার—যারা হামাস নেতাদের আশ্রয় দিয়ে আসছে—তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপুল অর্থায়ন করে এবং আল জাজিরার মতো সংবাদমাধ্যমগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েল।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, তুরস্ক হামাসকে আশ্রয় দিচ্ছে এবং এরদোয়ান নিজেই হাজার হাজার কুর্দি হত্যা ও উত্তর সাইপ্রাস অবৈধভাবে দখলের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত। গ্রিসকে হুমকি দেওয়া এবং সাংবাদিকদের কারাগারে বন্দি রাখার অভিযোগও আনেন তিনি। জেরুজালেম নিয়ে এরদোয়ানের মন্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, এটি কেবল ইসরায়েলের শহর এবং এর মালিকানা তুরস্কের নয়।
গাজায় ত্রাণ নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, ইসরায়েল সেখানে খাদ্য সরবরাহ এবং পোলিও টিকা নিশ্চিত করতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। যদিও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে গাজায় দীর্ঘ সময় ত্রাণ বাধাগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নেতানিয়াহু বলেন, যুদ্ধের কৌশল হিসেবে তারা বেসামরিক জনগণের জানমালের সুরক্ষায় নিয়মিত চেষ্টা চালিয়েছেন।
নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহারান মামদানিকে লক্ষ্য করে তিনি বলেন, তার শহরে ইহুদিরা এখন আর নিরাপদ বোধ করছেন না। তিনি মামদানিকে হামাসের সহযোগী এবং ইহুদিবিদ্বেষী হিসেবে উল্লেখ করে অভিযোগ করেন যে, মেয়র হামাস সন্ত্রাসীদের অপকর্মের দলিল প্রকাশে অস্বীকৃতি জানানো এক সাংবাদিককে নিজ বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আইসিসির গ্রেফতারি পরোয়ানা বা যুদ্ধের সমালোচনা নিয়ে তিনি বলেন, সত্য চাপা দিয়ে তাকে থামানো সম্ভব নয়।
নেতানিয়াহু হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইহুদিরা আর অসহায় শিকার হয়ে কসাইখানায় যাবে না। কারণ এখন তাদের নিজস্ব রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনী রয়েছে। সবশেষে তিনি ইহুদিদের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান এবং ‘বর্বরদের’ মোকাবিলায় বিশ্বকে একজোট হওয়ার ডাক দেন।