
সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পাদিত পরমাণু সহযোগিতা চুক্তি নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের ভেতর তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার একটি গোপন মূল্যায়নে দেখা গেছে, রিয়াদ পরমাণু অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করে দেয়নি। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই গোয়েন্দা মূল্যায়নটি আইনপ্রণেতাদের কাছে উপস্থাপিত গোপন নথির অংশ ছিল। তবে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভিন্ন একটি মূল্যায়নে চুক্তির সুরক্ষা ব্যবস্থা ও সৌদি আরবের আশ্বাসের বিষয়ে কিছুটা আস্থা প্রকাশ করেছে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আলাদাভাবে একটি মূল্যায়ন দিয়েছে বলে জানা গেছে।
চলতি বছরের জুলাই মাসে স্বাক্ষরিত ‘সেকশন ১২৩’ চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরবের বেসামরিক পরমাণু প্রকল্পে মার্কিন কোম্পানিগুলোর শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগের আইনি পথ প্রশস্ত হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এই চুক্তি কেবল পরমাণু বিস্তার রোধের মানদণ্ডই শক্তিশালী করবে না, বরং সৌদি আরবকে রাশিয়া বা চীনের প্রভাব থেকে দূরে রাখতে সহায়তা করবে। চুক্তিটি গত ২৪ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন কংগ্রেসে জমা দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে এটি ৯০ দিনের পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। জুলাইয়ে স্বাক্ষরিত তথাকথিত সেকশন ১২৩ চুক্তি সৌদি আরবে বেসামরিক পরমাণু প্রকল্পে কয়েক হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগে মার্কিন কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণের আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে।
চুক্তির শর্তানুসারে, শুরুতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ৫ শতাংশের নিচে রাখার কথা। তবে পরবর্তী সময়ে গবেষণা সাপেক্ষে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের লিখিত অনুমতি নিয়ে তা ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। যদিও ২০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরাসরি অস্ত্র তৈরির উপযোগী নয়, তবুও এর ফলে ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করা সহজতর হয়ে যায়। এছাড়া চুক্তিতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) ‘অ্যাডিশনাল প্রটোকল’ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা না থাকায় পরিদর্শকদের কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এর বদলে ওয়াশিংটন ও রিয়াদ একটি দ্বিপক্ষীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছে।
সিনেটর এড মার্কি ও জেফ মার্কির নেতৃত্বে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে সতর্ক করে জানিয়েছেন, এই চুক্তি রিয়াদকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতাও দিতে পারে। মার্কি বলেন, সৌদি আরব কেন স্থানীয়ভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, তা তাদের কর্মসূচির উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ তৈরি করেছে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাফ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই সৌদি আরবের কোনো সামরিক পরমাণু কর্মসূচিকে সমর্থন করে না এবং ভবিষ্যতেও করবে না। এই প্রটোকলের আওতায় পরিদর্শকরা আরও বিস্তৃতভাবে পরমাণু স্থাপনায় প্রবেশ করতে পারেন এবং ঘোষণার বাইরে কোনো পরমাণু কার্যক্রম চলছে কি না, তা শনাক্তের জন্য অতিরিক্ত সুযোগ পান। মার্কিন আইনপ্রণেতারা চাইলে চুক্তিটি আটকে দেয়ার উদ্যোগ নিতে পারেন।
সৌদির জ্বালানিমন্ত্রী আবদুল আজিজ বিন সালমান অবশ্য বারবার আশ্বস্ত করে বলেছেন, তাদের পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ এবং স্বচ্ছতার সঙ্গেই পরিচালিত হবে। তথাপি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ২০১৮ সালের একটি বক্তব্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে, যেখানে তিনি বলেছিলেন, ইরান যদি পরমাণু বোমা তৈরি করে তবে রিয়াদও যত দ্রুত সম্ভব একই পথ অবলম্বন করবে। আইনপ্রণেতারা এই বিষয়টিকে ২০১৫ সালের ইরান পরমাণু চুক্তির সঙ্গে তুলনা করছেন, যেখান থেকে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে বেরিয়ে এসেছিলেন। সেই চুক্তিতে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমান চুক্তিটি বাতিলের জন্য কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন, যা প্রেসিডেন্ট ভেটো দিলে অতিক্রম করা চ্যালেঞ্জিং হবে। ওই চুক্তিতে ১৫ বছরের জন্য ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল।