
কলাপাড়ার খালগুলো এখন শুধুই ইতিহাস
দখল–দূষণ আর পলিথিনে ভরাট, হারাচ্ছে শহরের প্রাণ চিংগরিয়া খাল
কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি:
এক সময় কলাপাড়ার খালগুলো ছিল জীবন্ত স্রোতস্বিনী। নৌকা, ট্রলার আর মানুষের আনাগোনায় মুখর থাকত পটুয়াখালীর কলাপাড়া পৌর শহরের এসব খাল। এখন সেসব খাল কেবলই ইতিহাস। দখল, দূষণ, ময়লা-আবর্জনা, পলিথিন ও পলি মাটিতে ভরাট হয়ে খালগুলো হারিয়েছে তাদের প্রাণচাঞ্চল্য।
শহরের প্রধান চিংগরিয়া খালও এর ব্যতিক্রম নয়। একসময় যে খাল দিয়ে শহরের বাণিজ্যিক যাতায়াত চলত, এখন সেখানে জমেছে আবর্জনা ও বর্জ্যের স্তূপ। বর্ষাকালে কিছুটা পানি থাকলেও শুকনো মৌসুমে খালের পানি পচে দুর্গন্ধ ছড়ায়, জন্ম নেয় ডেঙ্গুসহ নানা রোগজীবাণু। এতে খালের দুই পাড়ে বসবাসরত পৌরবাসীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।
অথচ খালই শহরের প্রাণ, প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের অন্যতম উৎস। কিন্তু দখল ও শ্রেণি পরিবর্তনের কারণে এখন এসব খালের অস্তিত্ব সংকট দেখা দিয়েছে।
আইনি লড়াই ও সচেতনতায় মাঠে বেলা
পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) স্থানীয়দের আবেদনের ভিত্তিতে ২০২৩ সালে উচ্চ আদালতে জনস্বার্থে রিট (পিটিশন নং ১৪৭২৯/২০২৩) দায়ের করে। আদালতের রুল জারির পর থেকে বেলা মাঠ পর্যায়ে স্থানীয় জনগণ, প্রশাসন ও গণমাধ্যমের অংশগ্রহণে সচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করে।
জানা গেছে, উপজেলা ভূমি অফিস খাল হিসেবে রেকর্ডভুক্ত কিছু জমিকে “নাল” শ্রেণিতে পরিবর্তন করে কয়েকটি সেটেলমেন্ট কেসের (৮২-কে/৮০-৮১, ৯০-কে/৮৬-৮৭, ৭৭৯-কে/৮৬-৮৭ ও ৭৭৭-কে/৮৬-৮৭) মাধ্যমে ব্যক্তি বিশেষের নামে বন্দোবস্ত দেয়। পরবর্তীতে এসব ব্যক্তি খালের উপর বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ ও স্থাপনা নির্মাণ করেন। এতে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে কলাপাড়া পৌর এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।
উপকারভোগী সমন্বয় সভা
চিংগরিয়া খাল পুনরুদ্ধার ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বুধবার সকাল ১১টায় উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে বেলার উদ্যোগে উপকারভোগী সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাউছার হামিদ এবং সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও বেলার নেট সদস্য মেজবাহ উদ্দিন মান্নু।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোখছেদুল আলম, সিপিপি পরিচালক আসাদুজ্জামান খান, কলাপাড়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি শামসুল আলমসহ অন্যান্য অতিথিবৃন্দ।
বেলার বিভাগীয় সমন্বয়কারী লিঙ্কন বায়েন স্বাগত বক্তব্য ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
‘সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া খাল বাঁচানো সম্ভব নয়’
সভায় পরিবেশবিদ মেজবাহ উদ্দিন মান্নু বলেন,
> “খাল বাঁচাতে পৌরবাসী, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে। প্রথমে সব খাল চিহ্নিত করে দখলদারদের উচ্ছেদে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।”
বেলার পক্ষ থেকে জানানো হয়, খাল দখল ও শ্রেণি পরিবর্তন করে লিজ দেওয়া পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ভূমি ব্যবস্থাপনা বিধি ও সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদ পরিপন্থী। আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন ও খালের প্রাকৃতিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে তারা আইনি সহায়তা ও মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম অব্যাহত রাখবেন।
‘আইনের বাইরে কোনো পদক্ষেপ নয়’ — ইউএনও কাউছার হামিদ
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাউছার হামিদ বলেন,
> “আমরা সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আইনের বাইরে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারি না। সাধারণ নাগরিক থেকে প্রশাসন—সবারই আদালতের সিদ্ধান্ত মেনে চলতে হবে। অনেক সময় দেখা যায় নদীকে খাল, আর খালকে নাল দেখিয়ে কেউ কেউ সরকারি জমি দখল করছে—যা সম্পূর্ণ বেআইনি।”
পরিবেশবাদীরা মনে করছেন, প্রশাসন, জনগণ ও গণমাধ্যম একসঙ্গে কাজ করলে একদিন হয়তো আবার প্রবাহ ফিরে পাবে কলাপাড়ার হারিয়ে যাওয়া খালগুলো।