বিদেশে চিকিৎসা নির্ভরতা কমাতে চিকিৎসকদের মানবিক হওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ ৬৯,৪০৯ কোটি টাকার বাজেট, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী ও ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগের ঘোষণা
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
দেশের মানুষ যেন উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী না হন, সে লক্ষ্যে চিকিৎসকদের আরও মানবিক, দায়িত্বশীল ও রোগীবান্ধব হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, প্রতিবছর চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। এই প্রবণতা কমাতে দেশের চিকিৎসকদের প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস আরও শক্তিশালী করতে হবে।
শনিবার (১১ জুলাই) ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘ডিএমসি ডে’ ও মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বহু মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাচ্ছেন। এতে যেমন বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে, তেমনি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার প্রশ্নও সামনে আসছে।
তিনি বলেন, “কেন আমরা এই পরিস্থিতির পরিবর্তন করতে পারব না? কেন আমাদের চিকিৎসকদের ওপর মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় করতে পারব না?”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন শুধু আইন বা কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এটি সম্ভব চিকিৎসকদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, আন্তরিকতা এবং সঠিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে। তিনি দেশের সব মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক এবং শিক্ষার্থীদের রোগীদের আস্থা অর্জনে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, একটি সুস্থ জাতি গড়ে তুলতে শুধু হাসপাতাল নির্মাণই যথেষ্ট নয়। পারিবারিক সচেতনতা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এ লক্ষ্যে সরকার সারা দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, নিয়োগপ্রাপ্তদের ৮০ শতাংশ নারী হবেন, যারা পরিবারভিত্তিক প্রাথমিক ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবেন। পাশাপাশি সরকারি পর্যায়ে আরও ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ দেওয়া হবে।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা আরও কার্যকর করতে সরকার হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে দেশের সব উপজেলা হাসপাতালকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে। পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্ট, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর শূন্যপদ দ্রুত পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০ জন করে আনসার সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসা ব্যয় কমাতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হার্টের স্টেন্ট, হার্টের ভাল্ব, পেসমেকার, অক্সিজেনেটর, চোখের লেন্স এবং ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কয়েকটি কাঁচামালের ওপর ভ্যাট ও কর কমানো হয়েছে; কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ প্রত্যাহারও করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। আগামী পাঁচ বছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “চিকিৎসকগণই সত্যিকার অর্থে মানুষের বিপদের বন্ধু। একজন চিকিৎসকের আন্তরিক ব্যবহার অনেক সময় ওষুধের মতোই কার্যকর হয়। তাই পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি মানবিক মানুষ হয়ে ওঠাও একজন চিকিৎসকের জন্য অত্যন্ত জরুরি।”
ঢাকা মেডিকেল কলেজকে দেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনসহ বিভিন্ন জাতীয় অধ্যায়ে এই প্রতিষ্ঠানের গৌরবোজ্জ্বল অবদান রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ঐতিহ্য ধরে রেখে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ভবিষ্যতে বিশ্বমানের গবেষণা, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ডা. জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী দুটি ছাত্রী হোস্টেলের নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং বেলুন ও শান্তির প্রতীক পায়রা উড়িয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।