• রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২৮ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :

প্রস্তাবিত সাইবার আইনের খসড়া নিয়ে সাংবাদিকদের উদ্বেগের কারণগুলো কী

রিপোর্টার: / ০ পঠিত
আপডেট: রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬

প্রস্তাবিত ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর বিভিন্ন ধারা দেশে সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা। আইনের বেশ কিছু অস্পষ্ট সংজ্ঞার কারণে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও ভিন্নমতের চর্চা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে অনলাইন কনটেন্ট অপসারণ, মানহানি, বুলিং এবং ডিজিটাল ডিভাইস তল্লাশির মতো বিষয়গুলো নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

খসড়ার ৮(২) ধারা অনুযায়ী, শুধুমাত্র প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে নয়, বরং সম্ভাব্য আশঙ্কার অজুহাতেও যেকোনো অনলাইন কনটেন্ট ব্লক বা অপসারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষমতা ব্যবহারের ফলে রাষ্ট্রের বা কোনো ব্যক্তির জন্য ‘মানহানিকর’ হিসেবে চিহ্নিত করে যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন সরিয়ে ফেলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের জন্য ‘মানহানিকর’ বা ‘অবমাননাকর’ তথ্যও এর আওতায় আসতে পারে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে জরুরি পরিস্থিতি বা দ্রুত পরিবর্তনশীল ঘটনার সময় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব নাও হতে পারে।

আইনের ২৫ নম্বর ধারাটিও বিশেষ মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এখানে যৌন হয়রানি বা পর্নোগ্রাফির পাশাপাশি মানহানি, অপমান, হেয়প্রতিপন্ন করা ও বুলিংকে একই অপরাধের তালিকায় রাখা হয়েছে। ব্লাস্টের মতো অধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলেছে, বুলিংয়ের পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক ও অস্পষ্ট। এর ফলে রাজনৈতিক সমালোচনা, ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপন, ভোক্তার অভিযোগ কিংবা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মতো বিষয়গুলোও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ব্লাস্টের পক্ষ থেকে মানহানি ও হেয়প্রতিপন্ন করার বিষয়গুলো এই ধারা থেকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। সংগঠনটি ধারা ২৫ থেকে মানহানি ও হেয়প্রতিপন্ন করার বিষয় বাদ দেওয়ার পাশাপাশি বুলিংয়ের অপরাধকে গুরুতর, ইচ্ছাকৃত ও ধারাবাহিক ডিজিটাল হয়রানি, হুমকি বা নির্যাতনের মধ্যে সীমিত করার সুপারিশ করেছে। ব্লাস্টও বলেছে, যাচাই না করা তথ্য মানেই মিথ্যা তথ্য নয়। এতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

প্রস্তাবিত ২৬(ক) ধারায় ‘গুজব’ ও ‘ভুল তথ্য’ ছড়ানোকে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এই অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড বা ৪০ লাখ টাকা জরিমানার মতো বিধান রয়েছে। তবে ‘গুজব’ বা ‘ভুল তথ্য’র কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি সংজ্ঞা না থাকায় এর অপব্যবহারের আশঙ্কা প্রবল। জরুরি পরিস্থিতিতে তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও কোনো সংবাদ প্রকাশ পেলে তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে করার ঝুঁকি থেকে যায়, যে কারণে এই ধারাটি বাতিলের দাবি তোলা হয়েছে।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নে ৩৩ ও ৩৪ নম্বর ধারাগুলো উদ্বেগের মূল কারণ। এই ধারাগুলোর মাধ্যমে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস ও সংরক্ষিত ডেটায় প্রবেশের পাশাপাশি সেগুলো তল্লাশি ও জব্দ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় ব্যবহৃত গোপনীয় সূত্রের পরিচয় বা তথ্য ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় পেশাদার সাংবাদিকদের কাজের পরিধি সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আইনের বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। খসড়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তাব করা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে বিচারিক ক্ষমতা থাকলে প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। এছাড়া, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই খসড়ার সমালোচনা করে বলেছেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং মতপ্রকাশের অধিকারকে একসূত্রে গাঁথতে গিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথ তৈরি করা হয়েছে।

সাংবাদিকদের মধ্যে এর ফলে মামলা ও গ্রেপ্তারের ভয় থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা সেলফ-সেন্সরশিপ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, আইনটি কোনোভাবেই দমনমূলক হবে না। ২৮ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, সরকার সাংবাদিক বা গণমাধ্যম যাতে এই আইনের শিকার না হয় সে বিষয়ে সতর্ক রয়েছে। একই সাথে সাংবাদিক, সম্পাদক ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়। খসড়াটি চূড়ান্ত করার আগে মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে বলে সরকার দাবি করছে। এদিকে সরকার বলছে, খসড়াটি চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত বিবেচনা করা হচ্ছে। জুলাইয়ে খসড়া পর্যালোচনা ও চূড়ান্তকরণের জন্য মন্ত্রিসভা কমিটির সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ