
দেশভাগের অনেক আগে থেকেই যে নৌপথটি চা, কাঠ ও কয়লা পরিবহনের প্রধান মাধ্যম ছিল, দীর্ঘ কয়েক দশক পর তা আবারও সচল হয়েছে। ভারতের আসাম রাজ্যের চা-নগরী ডিব্রুগড় থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে ৫৪০ টন মিথানল নিয়ে ‘ডিএলবি পাতকাই’ নামক একটি জাহাজ যাত্রা শুরু করেছে। এই ঐতিহাসিক যাত্রার মাধ্যমে ১৯৪৭ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া নৌপথটি নতুন করে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ফিরল। বগীবিল থেকে জাহাজটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ভারতের কেন্দ্রীয় নৌপরিবহন ও জলপথমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল। ভার্চুয়ালি এ অনুষ্ঠানে যুক্ত ছিলেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। কয়েক দশক ধরে যা ছিল না, তা হলো এটিকে পুনরুজ্জীবিত করার ইচ্ছা।
ব্রিটিশ আমলে কলকাতা থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ হয়ে ডিব্রুগড়ে স্টিমার যাতায়াত করত। ১৮৫৬ সাল থেকে এই নৌপথটি পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত হতো এবং ১৯১৩ সাল নাগাদ নিয়মিত স্টিমার চলাচল করত। তবে ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগের পর এই নৌপথে ছেদ পড়ে এবং ১৯৫০ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের ফলে নদীর তলদেশের গঠনে পরিবর্তন আসে। ১৯৫৪ সাল থেকে পণ্য বুকিং বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর ডিব্রুগড় নদীবন্দরটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর আন্তঃসীমান্ত নৌ-বাণিজ্য পুরোপুরি থমকে গিয়েছিল।
ডিব্রুগড়ে বেড়ে ওঠা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল বলেন, একসময় ডিব্রুগড়ের মানুষ স্টিমারের বাঁশির শব্দ শুনে অভ্যস্ত ছিল। প্রায় ৭০ বছর সেই বাঁশির শব্দ স্তব্ধ থাকলেও নদী আমাদের কখনো ব্যর্থ করেনি। বর্তমানে ডিব্রুগড়কে আবারও তার হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা মন্তব্য করেন যে, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এখন আর কেবল সীমান্তবর্তী এলাকা নয়, বরং ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করছে। এই পরীক্ষামূলক যাত্রা সফল হলে বাংলাদেশে নিয়মিত মিথানল রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সম্প্রতি বগীবিল ও ধুবড়িতে কাস্টমস ও অভিবাসন ব্যবস্থা চালু হওয়ার কারণেই এ ধরনের চালান পাঠানো সহজ হয়েছে। সনোয়াল বলেন, ভারতের চা রাজধানী হিসেবে পরিচিত ডিব্রুগড় একসময় যে মহান নদীবন্দর হিসেবে গৌরব অর্জন করেছিল, তা আবার ফিরে পাচ্ছে।
১৯৭২ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নদীপথে বাণিজ্য প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়। এরপর ১৯৮৮ সালে সাদিয়া থেকে ধুবড়ি পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদের ৮৯১ কিলোমিটার অংশকে ‘জাতীয় জলপথ-২’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে নিয়মিত পণ্য পরিবহন শুরু হতে আরও সময় লাগে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সিমেন্ট পরিবহনের মাধ্যমে গুয়াহাটির পান্ডু থেকে ধুবড়ি পর্যন্ত নৌ-বাণিজ্য ফের শুরু হয়। এরপর ২০২২ সালে টাটা স্টিলের বার্জ বাংলাদেশ হয়ে পান্ডুতে পৌঁছে এবং ২০২৩ সালে ‘এমভি গঙ্গা বিলাস’ পর্যটক জাহাজ বারাণসী থেকে ডিব্রুগড় যাত্রা করে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বগীবিল যাত্রী ও পণ্য টার্মিনালটি চালু করা হয়। ১৮৮২ সালে ডিব্রুগড় স্টিমার ঘাট থেকে ‘ডিব্রু-সাদিয়া রেলওয়ে’ চলাচল শুরু করে।
সর্বানন্দ সনোয়ালের তথ্যমতে, ভারতের জাতীয় জলপথে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ ২০১৩-১৪ অর্থবছরের ১ কোটি ৮০ লাখ টন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২১ কোটি ৮০ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জলপথ অবকাঠামো উন্নয়নে ৭৭ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এর মধ্যে পান্ডু বন্দরের আধুনিকায়ন এবং জাহাজ মেরামতের সুবিধা তৈরিসহ বিভিন্ন প্রকল্প রয়েছে। সনোয়াল জোর দিয়ে বলেন যে, নদীপথে পণ্য পরিবহন জ্বালানি খরচ কমায় এবং মহাসড়কে ট্রাকের চাপও লাঘব করে। ভারত বর্তমানে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সাথে আঞ্চলিক জলপথ সংযোগ স্থাপনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্রহ্মপুত্রকে উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে বিদেশি বাজারে পণ্য পরিবহনের বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর করিডর হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না, এই যাত্রাকে তার পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আমরা বিশ্বমানের অবকাঠামো গড়ে তুলছি এবং একই সঙ্গে এর ঐতিহ্যও সংরক্ষণ করছি। বর্তমান বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যেই এই ঘটনাকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন কর্মকর্তারা।