• রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৬ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
৩০ কোটি নয়, ৩০০ মিলিয়ন ডলারে চট্টগ্রামে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবের পরিকল্পনা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ গড়তে যুবসমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর অদক্ষতা ও অসদাচরণের অভিযোগে বিচারক আরিফুল সাময়িক বরখাস্ত পরিবেশ রক্ষায় দায়িত্বের বাইরে গিয়েও কাজ করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের অগ্রাধিকারেই সংস্কার, উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তার আশ্বাস কৃষিকে লাভজনক খাতে রূপান্তরের তাগিদ রাষ্ট্রপতির, গুরুত্ব সংরক্ষণ ও গবেষণায় কালিগঞ্জের মথুরেশপুর জামায়াতের অফিস উদ্বোধন বিমান বহরে যুক্ত হচ্ছে এয়ারবাসের ১০ উড়োজাহাজ দেশের চার অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরে কমছে যাত্রী সংখ্যা তিন সিটির উন্নয়নে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন

৩০ কোটি নয়, ৩০০ মিলিয়ন ডলারে চট্টগ্রামে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবের পরিকল্পনা

রিপোর্টার: / ৮ পঠিত
আপডেট: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬

 

৩০ কোটি নয়, ৩০০ মিলিয়ন ডলারে চট্টগ্রামে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবের পরিকল্পনা

রানওয়ে ৩ হাজার ৬০০ মিটার করার প্রস্তাব | কার্গো ভিলেজ ও ট্রানজিট সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ | বাড়বে আন্তর্জাতিক আকাশ যোগাযোগের সম্ভাবনা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে রানওয়ে সম্প্রসারণ, পৃথক ট্রানজিট সেন্টার, আধুনিক কার্গো ভিলেজ এবং যাত্রীসেবার অবকাঠামো উন্নয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামের সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং চীনের আকাশ যোগাযোগ সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি দেশের আমদানি-রপ্তানি ও বিনিয়োগ কার্যক্রমেও নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ‘চট্টগ্রাম রিজিওনাল এয়ার হাব প্রজেক্ট’ নামে একটি প্রকল্পের প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) তৈরি করা হয়েছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সমন্বয়ে প্রস্তাবটি প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের সময়সীমা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

রানওয়ে বাড়বে ৩ হাজার ৬০০ মিটার

প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বর্তমান ২ হাজার ৯৪০ মিটার রানওয়ে পর্যায়ক্রমে ৩ হাজার ৬০০ মিটারে উন্নীত করার কথা রয়েছে। পাশাপাশি রানওয়ে শক্তিশালীকরণ, সমান্তরাল ট্যাক্সিওয়ে ও দ্রুত প্রস্থান ট্যাক্সিওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রস্তাবে ১১টি ন্যারো-বডি উড়োজাহাজ পার্কিং স্ট্যান্ডের পাশাপাশি আটটি ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ পার্কিং স্ট্যান্ড রাখার কথা উল্লেখ রয়েছে। বার্ষিক যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা ৫০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৮০ লাখ থেকে এক কোটি করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমান দুটি বোর্ডিং ব্রিজের সংখ্যা বাড়িয়ে ছয়টি করার প্রস্তাব রয়েছে, যার মধ্যে চারটি ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজের উপযোগী হবে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বোয়িং ৭৭৭, বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার এবং এয়ারবাস এ৩৩০ ও এ৩৫০-এর মতো বড় উড়োজাহাজ পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব উড়োজাহাজের নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনা নির্ভর করবে বিমানবন্দরের চূড়ান্ত কারিগরি সক্ষমতা, নিরাপত্তা মানদণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থাগুলোর বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের ওপর।

১০ মিলিয়ন ডলারে ট্রানজিট সেন্টার, গুরুত্ব কার্গো ভিলেজে

প্রস্তাবিত প্রকল্পে প্রায় ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে পৃথক ট্রানজিট সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক যাত্রীদের ট্রানজিট সুবিধা বাড়ানো এবং চট্টগ্রামকে সংযোগকারী বিমানবন্দর হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

একই সঙ্গে কার্গো পরিবহনের সক্ষমতা বাড়াতে নতুন কার্গো ভিলেজ, কোল্ড-চেইন ব্যবস্থাপনা এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউস নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে বছরে ৭৫ হাজার থেকে এক লাখ টন পণ্য ব্যবস্থাপনার উপযোগী অবকাঠামো তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তৈরি পোশাকের নমুনা, পচনশীল কৃষিপণ্য, হিমায়িত খাদ্য, ইলেকট্রনিকস ও জরুরি ওষুধ দ্রুত পরিবহনে উন্নত কার্গো সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এতে চট্টগ্রাম ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলের ব্যবসায়ীরা উপকৃত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য সরবরাহের সময় ও ব্যয় কমানোর সুযোগ পাবেন।

এডিবির কাছে ১৭৫ মিলিয়ন ডলার সহায়তার উদ্যোগ

প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার নির্ধারণের কথা জানানো হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম পর্যায়ে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন পরিকল্পনার উল্লেখ রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছে প্রায় ১৭৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ বা অর্থসহায়তা চাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট ৭৫ মিলিয়ন ডলার সরকার ও বেবিচকের মাধ্যমে জোগানের পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া বিমানবন্দরের আশপাশে হোটেল, শপিং মল, বাণিজ্যিক স্থাপনা এবং অন্যান্য সহায়ক সেবা গড়ে তুলতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে আরও ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে।

তবে প্রস্তাবিত অর্থায়নের পরিমাণ, ঋণ অনুমোদন এবং বিনিয়োগের চূড়ান্ত কাঠামো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম চেম্বারের উদ্যোগে নতুন গতি

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বাসসকে বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় চট্টগ্রাম অনেক আগেই এ অঞ্চলের আকাশ যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।

তিনি জানান, গত ১৫ আগস্ট অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে চট্টগ্রাম চেম্বারের পক্ষ থেকে বিমানবন্দরের উন্নয়নসংক্রান্ত একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়। পরে সরকার ‘চট্টগ্রাম রিজিওনাল এয়ার হাব’ প্রকল্পের উদ্যোগ নেয়।

আমিরুল হকের মতে, প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও শিল্প-সহযোগিতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে সরাসরি আকাশ যোগাযোগের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

২৪ ঘণ্টা চালুর দাবি এভিয়েশন সংশ্লিষ্টদের

চট্টগ্রাম এভিয়েশন ক্লাবের সভাপতি মো. আছিফ চৌধুরী বাসসকে বলেন, বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক হাবে রূপ দিতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না; প্রতিযোগিতামূলক সেবা, উন্নত যাত্রীসুবিধা এবং আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোকে আকৃষ্ট করার উদ্যোগও নিতে হবে।

তার মতে, বিমানবন্দরটি ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা, ল্যান্ডিং চার্জ প্রতিযোগিতামূলক করা, উন্নত লাউঞ্জ ও লাগেজ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উড়োজাহাজের জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম, হংকং ও তাইওয়ানমুখী বিমান সংস্থাগুলোকে আকৃষ্ট করার জন্য কার্যকর বিপণন ও ব্র্যান্ডিং কার্যক্রম চালানোরও পরামর্শ দেন তিনি।

বিকল্প হাব হওয়ার সম্ভাবনা দেখছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ

শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ নূর হোসেন বাসসকে বলেন, কোনো বিমানবন্দরকে কার্যকর এভিয়েশন হাবে পরিণত করতে উড়োজাহাজ অবতরণের সুবিধার পাশাপাশি জ্বালানি, হোটেল, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য সহায়ক সেবা নিশ্চিত করতে হয়।

তিনি জানান, বর্তমানে বিমানবন্দরটিতে অতিরিক্ত ফ্লাইট পরিচালনার মতো কিছু অবকাঠামোগত সক্ষমতা রয়েছে। তবে সেটিকে পূর্ণাঙ্গ হাবে রূপ দিতে বিমান সংস্থাগুলোর বাণিজ্যিক পরিকল্পনা, ফ্লাইটের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় সহায়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন জরুরি।

তার মতে, শুরুতে কারিগরি যাত্রাবিরতি বা ‘টেকনিক্যাল স্টপওভার’ সেবার ওপর গুরুত্ব দেওয়া বাস্তবসম্মত হতে পারে। পরবর্তী সময়ে বিমান সংস্থাগুলোর চাহিদা ও যাত্রী পরিবহনের সম্ভাবনা বাড়লে ট্রানজিট কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।

অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?

চট্টগ্রাম দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলের কেন্দ্র। এ অঞ্চলে বিমান যোগাযোগের সক্ষমতা বাড়লে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও পর্যটকদের যাতায়াত সহজ হতে পারে। পাশাপাশি উচ্চমূল্যের ও দ্রুত সরবরাহযোগ্য পণ্য আকাশপথে পরিবহনের সুযোগ বাড়বে।

তবে প্রস্তাবিত প্রকল্পের অর্থায়ন, অনুমোদন, বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। পরিকল্পনা অনুযায়ী অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রতিযোগিতামূলক সেবা নিশ্চিত করা গেলে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক বিমান চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার পথ উন্মুক্ত হতে পারে।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ