• শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ০৯:০৬ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
কবি আল মুজাহিদীর মৃত্যুতে বিএফইউজে-ডিইউজের শোক, শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে প্রথম জানাজা কবি আল মুজাহিদীর মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক: ‘সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি হলো’ ছয় মাসে পাঁচ অঞ্চলে চালু হচ্ছে ২০০ শয্যার বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে জোর প্রস্তুতি রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনে জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান বাংলাদেশের একনেকেই পাস হচ্ছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা, তিস্তাপারের মানুষের আর কোনো চিন্তা নেই: পানি সম্পদ মন্ত্রী এ্যানি শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বিনিয়োগই জাতি গঠনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শেষ মুহূর্তে ভেস্তে গেল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি বৈঠক, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন শঙ্কা জনগণের ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা, সরকারপ্রধানকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারকে সময় দেওয়া যাবে না’ বলাদের বিরুদ্ধে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর মূলধারার রাজনীতি ও ব্যবসায় আরও সক্রিয় হোন’—যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি ড. তিতুমীরের আহ্বান

বৈঠা হাতে ২৫ বছরের সংগ্রাম: ৭৮ বছরেও খেয়া নৌকা চালিয়ে জীবনযুদ্ধ তাসলিমার

রিপোর্টার: / ১৪ পঠিত
আপডেট: বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬

বৈঠা হাতে ২৫ বছরের সংগ্রাম: ৭৮ বছরেও খেয়া নৌকা চালিয়ে জীবনযুদ্ধ তাসলিমার

নিজস্ব প্রতিবেদক:

স্বামীর মৃত্যুর পর চার শিশু সন্তানকে নিয়ে জীবনযুদ্ধের কঠিন বাস্তবতায় পড়েছিলেন শরীয়তপুরের তাসলিমা বেগম। সংসারের হাল ধরতে বাধ্য হয়ে হাতে তুলে নিয়েছিলেন স্বামীর রেখে যাওয়া খেয়া নৌকার বৈঠা। সেই থেকে শুরু। আজ ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে মেঘনার শাখা নদীতে খেয়া নৌকা চালিয়ে মানুষ ও কৃষিপণ্য পারাপার করে জীবিকা নির্বাহ করছেন ৭৮ বছর বয়সী এই সংগ্রামী নারী।

তাসলিমা বেগমের বাড়ি শরীয়তপুর জেলার গোসাইরহাট উপজেলার কোদালপুর ইউনিয়নের হাজীপাড়া এলাকায়। ইউনিয়নের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মেঘনা নদীর একটি শাখা নদীতে নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন তাঁর স্বামী নাসির সরদার। কিন্তু ২৬ বছর আগে স্বামীর মৃত্যুর পর চার সন্তানকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়ে যান তিনি।

অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে তাসলিমা নিজেই নৌকা নিয়ে নদীতে নামেন। পরবর্তীতে ২০০১ সালে হাজীপাড়া এলাকায় একটি খেয়াঘাট স্থাপনের পর সেখানে নিয়মিত যাত্রী ও কৃষিপণ্য পারাপারের কাজ শুরু করেন।

স্থানীয়দের মতে, কোদালপুর একটি কৃষি ও মৎস্যনির্ভর চরাঞ্চল। এখানকার মানুষদের নানা প্রয়োজনে নদী পারাপার করতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে সেই দায়িত্ব পালন করে আসছেন তাসলিমা বেগম।

খেয়া নৌকা চালিয়ে যে আয় হয়, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চালিয়েছেন তিনি। নগদ আয়ের পাশাপাশি ফসলের মৌসুমে গ্রামবাসীর কাছ থেকে ধান, চাল ও অন্যান্য কৃষিপণ্য পেয়ে তা বিক্রি করে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতেন। এই কঠিন সংগ্রামের মধ্যেই তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে বড় করে তুলেছেন এবং মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন।

তবে জীবনের কষ্ট এখানেই শেষ হয়নি। প্রায় পাঁচ বছর আগে নৌ দুর্ঘটনায় তাঁর একমাত্র ছেলে আলী আকবর একটি পা হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। ছেলের চিকিৎসার পেছনে সব সঞ্চয় ব্যয় করে নিঃস্ব হয়ে পড়েন তাসলিমা। বর্তমানে তাঁর ছেলে খেয়াঘাটের পাশে একটি ছোট চায়ের দোকান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ওসমান দেওয়ান বলেন, “তাসলিমা বেগমের জীবনের গল্প আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। দীর্ঘ ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। বয়সের ভারে তিনি এখন অনেকটাই ন্যুব্জ। তাঁকে দ্রুত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা উচিত।”

তাসলিমার বড় মেয়ে ফাহিমা বলেন, “আমরা ছোট থাকতেই বাবা মারা যান। মা নিজের কষ্টের কথা না ভেবে আমাদের মানুষ করেছেন। এখনও তিনি বৈঠা হাতে নদীতে নামেন। দারিদ্র্যের কারণে আমরা ইচ্ছা থাকলেও মায়ের যথাযথ খোঁজখবর নিতে পারি না।”

জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তাসলিমা বেগম। তিনি বলেন, “অনেকেই আমার গল্প শুনেছে, ছবি তুলেছে, কিন্তু কেউ পাশে দাঁড়ায়নি। স্বামীর মৃত্যুর পর মনে হয়েছিল নৌকাটাই আমার বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা। সেই নৌকায় ভর করেই ২৫ বছর কাটিয়ে দিলাম।”

তিনি জানান, নিজের নামে কোনো জমি নেই। অন্যের জমিতে একটি ঘর তুলে বসবাস করছেন। যখন জমির মালিক বলবেন, তখনই সেই জায়গা ছেড়ে দিতে হবে।

তাসলিমা বলেন, “আমার বড় স্বপ্ন ছিল সন্তানদের জন্য আর নিজের কবরের জন্য এক টুকরো জমি হবে। কিন্তু সে স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। এখন যে নৌকায় জীবিকা চলে, সেটাও প্রায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।”

নতুন নৌকা তৈরির জন্য সম্প্রতি একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা থেকে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন তিনি। কিন্তু মাসে ১০ হাজার টাকা কিস্তি পরিশোধের চিন্তায় এখন দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁর।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও মনে করছেন, তাসলিমার মতো সংগ্রামী নারী রাষ্ট্রীয় সহায়তার দাবিদার। কোদালপুর ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার দাদন ভুঁইয়া বলেন, “তিনি দীর্ঘদিন মানুষের সেবা করেছেন। বয়সের কারণে এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না। তাঁকে দ্রুত সরকারি পুনর্বাসনের আওতায় আনা প্রয়োজন।”

কোদালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, “ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে তাঁকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তিনি যে খেয়াঘাটে নৌকা চালান, সেই ঘাটের ইজারাও মওকুফ করা হয়েছে। তাঁকে একটি খাসজমি বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

এ বিষয়ে গোসাইরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুশরাত আরা খানম বলেন, “বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেনেছি। বিস্তারিত খোঁজখবর নিয়ে তাঁকে সরকারি সহায়তার আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হবে।”

নদীর ঢেউ, রোদ, ঝড় আর বৃষ্টির সঙ্গে লড়াই করে এক জীবনের অধিকাংশ সময় পার করেছেন তাসলিমা বেগম। বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও এখনো বৈঠা হাতে নদীর বুকে ভাসছেন তিনি। তাঁর একমাত্র চাওয়া—মাথা গোঁজার জন্য সামান্য এক টুকরো জমি আর জীবনের শেষ সময়ে একটু নিরাপত্তা।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ