‘ফ্রি কোটা অর ডাই’ লিখে রাজপথে প্রতিবাদের প্রতীক: জুলাই আন্দোলনের সাহসী মুখ আব্দুল্লাহ আল মামুন
উপশিরোনাম:
শহীদ নূর হোসেনের প্রতিবাদের প্রতিচ্ছবি হয়ে আলোচনায় আসা চবি শিক্ষার্থীর আন্দোলনের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ
নিজস্ব প্রতিবেদক:
১৯৮৭ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের শহীদ নূর হোসেনের বুকে লেখা ‘স্বৈরাচার নীপাত যাক’ স্লোগান যেমন এক সময় গণআন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেছিল, তেমনি ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে চট্টগ্রামের রাজপথে বুকে-পিঠে প্রতিবাদী স্লোগান লিখে আলোচনায় আসেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলের কর্মী মামুনের শরীরে লেখা ‘ফ্রি কোটা অর ডাই’, ‘কোটা থেকে মুক্তি দে, নইলে মোরে কবর দে’, ‘দফা ১, দাবি ১—কোটা নট কামব্যাক’-সহ বিভিন্ন স্লোগানের ছবি দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। তার সেই প্রতিবাদী উপস্থিতি আন্দোলনকারীদের সাহস জুগিয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরাঞ্চলের বার্তিপাড়া গ্রামের কৃষক পরিবারে বেড়ে ওঠা আব্দুল্লাহ আল মামুন নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ২০২২ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হন। পরিবারের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া সন্তান হিসেবে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে এলেও জুলাই আন্দোলনে তিনি রাজপথের সম্মুখসারির মুখ হয়ে ওঠেন।
মামুন জানান, মাত্র ১৫০ টাকার রঙ কিনে টানা তিন দিন নিজের বুকে ও পিঠে বিভিন্ন স্লোগান লিখে আন্দোলনে অংশ নেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, ষোলশহর, টাইগারপাস, মুরাদপুর, নিউমার্কেট ও বহদ্দারহাটসহ বিভিন্ন স্থানে জাতীয় পতাকা হাতে মিছিলের সামনের সারিতে অবস্থান করতেন তিনি।
আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, গত দেড় দশকে নির্বাচন, গুম, খুন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার ঘটনাগুলো তাকে আন্দোলনে নামতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
মামুনের দাবি, আন্দোলনের প্রথম দিকে তার বুকে লেখা স্লোগানের ছবি একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থায় প্রকাশিত হয়। পরে সেটি বিভিন্ন দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।
তিনি আরও দাবি করেন, আন্দোলনের সময় তিনি আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হুমকির মুখে পড়েন। নিরাপত্তার কারণে প্রায় প্রতিদিনই আশ্রয় পরিবর্তন করতে হতো। ১৫ জুলাই মুরাদপুর এলাকায় হামলার শিকার হওয়ার ঘটনাও স্মরণ করেন তিনি। তার ভাষ্য, এক মধ্যবয়সী নারী নিজের ছেলের টি-শার্ট পরিয়ে তাকে হোটেলকর্মীর ছদ্মবেশে হামলাকারীদের হাত থেকে বেরিয়ে যেতে সহায়তা করেছিলেন।
মামুন জানান, আন্দোলনের সময় তার ছবি গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পরিবার আতঙ্কিত হয়ে তাকে বাড়ি ফিরে আসার অনুরোধ জানায়। কিন্তু তিনি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। এমনকি একপর্যায়ে ছোট বোনকে নিজের ঋণ পরিশোধের কথাও বলে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন।
আন্দোলনে নিহত সহপাঠী হৃদয় চন্দ্র তরুয়া ও একই বিভাগের শিক্ষার্থী ফরহাদ হোসেনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মামুন। তিনি বলেন, হৃদয় একসময় তাকে বলেছিলেন—সামনের সারিতে থাকায় প্রথম গুলিটা হয়তো তার বুকেই লাগবে। কিন্তু ১৮ জুলাই বহদ্দারহাটে তার আগেই হৃদয় নিহত হন, যার স্মৃতি আজও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
আন্দোলনের সাহস কোথা থেকে পেয়েছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, তিউনিসিয়ার আরব বসন্তের প্রতীক মোহাম্মদ বুয়াজিজি এবং ১৯৮৭ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের শহীদ নূর হোসেনের আত্মত্যাগ তাকে অনুপ্রাণিত করেছে। তার ভাষায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস তিনি সেখান থেকেই পেয়েছেন।