
নিজস্ব প্রতিবেদক:
জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ ও সংসদে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, লংমার্চে কোনো ধরনের বাধা এলে তা মোকাবিলা করেই নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাবেন তারা।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে এসব কথা বলেন তিনি। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ছয় দফা দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এ লংমার্চের আয়োজন করা হয়।
সকাল ৭টায় কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সমাবেশ শুরু হয়। পরে সকাল সোয়া ৮টার দিকে গাড়িবহর চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়।
সমাবেশে শফিকুর রহমান বলেন, কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর জন্য নয়, ১৮ কোটি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই তারা রাজপথে নেমেছেন। জনগণের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেললে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
দেশের গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, নাগরিকরা প্রয়োজনীয় সেবা না পেলেও নিয়মিত বিল পরিশোধ করছেন। একই সঙ্গে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, দেশে কোনো চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজের অস্তিত্ব বরদাশত করা হবে না। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
১১ দলীয় জোটের ঘোষিত ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি তেল-গ্যাস ও সারের সংকট সমাধান, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ ও দলীয় রাজনীতি বন্ধ করা।
সমাবেশে ‘সিফাত’ নামে এক তরুণকে গ্রেপ্তার ও তাকে হয়রানির অভিযোগও তুলে ধরেন শফিকুর রহমান। তাকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনে দেশের ১৮ কোটি মানুষ প্রতিবাদী কণ্ঠে গর্জে উঠবে।
সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার যদি লংমার্চে বাধা দেয়, তাহলে ছয় দফা দাবি এক দফায় পরিণত হবে।
চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, মাদক, নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে গণভোটে জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেটের সঙ্গে সরকার বিশ্বাসঘাতকতা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার জনগণের কষ্ট দূর করতে ব্যর্থ হয়েছে। নীতিনির্ধারকদের বক্তব্যেও অসংগতি দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, প্রথম সংসদ অধিবেশনের ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার কাউন্সিল গঠনের কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। একইভাবে ছয় মাসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের যে সময়সীমার কথা বলা হয়েছিল, সেটিও শেষ হওয়ার পথে।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, জনগণের মধ্যে বিএনপিকে ভোট না দেওয়ার মনোভাব তৈরি হয়েছে। তিনি গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন।
দেশ পরিচালনায় সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের বেছে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে অলি আহমদ বলেন, বেইমান, মুনাফেক ও বিদেশি এজেন্টদের দিয়ে দেশ পরিচালনা করা যাবে না।
বাংলাদেশ খিলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকও সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন। তিনি সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের আহ্বান জানান এবং তা না হলে পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করেন।
ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী লংমার্চের পথে পাঁচটি স্থানে পথসভা করার কর্মসূচি রয়েছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের চিটাগাং রোডের ট্রাকস্ট্যান্ড, কুমিল্লার পদুয়া বাজার বিশ্বরোড, চৌদ্দগ্রাম, ফেনীর মহিপাল এবং মীরসরাইয়ে পথসভা করার কথা রয়েছে।
পদুয়া বাজারে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পথসভা শেষে জোহরের নামাজ ও খাবারের বিরতি দেওয়ার কথা রয়েছে। পরে চৌদ্দগ্রাম, মহিপাল ও মীরসরাইয়ে পথসভা হওয়ার কথা।
চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে সন্ধ্যা ৭টার দিকে সমাপনী সমাবেশ হওয়ার সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় কর্মসূচির সময়সূচিতে পরিবর্তন হতে পারে বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। লংমার্চের কারণে সাধারণ মানুষের সাময়িক ভোগান্তির জন্য আগাম দুঃখ প্রকাশও করেছেন তারা।
আয়োজকদের ঘোষিত পরবর্তী কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখী লংমার্চ, ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা অভিমুখী লংমার্চ এবং ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেট অভিমুখী লংমার্চ। সিলেটের কর্মসূচিটি রেলযাত্রার মাধ্যমে করার কথা রয়েছে।
এরপর ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
শনিবারের সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক এএইচএম হামিদুর রহমান আজাদ সভাপতিত্ব করেন। এতে জোটভুক্ত বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেন।