
নিজস্ব প্রতিবেদক, দিনাজপুর:
দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) বোটানিক্যাল গার্ডেনে সংরক্ষিত রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বিস্ময়কর ও বিরল বৃক্ষ বাওবাব। বিলুপ্তপ্রায় এই গাছটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্যই বৃদ্ধি করছে না, বরং শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীদের কাছে প্রকৃতির এক অনন্য বিস্ময় হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেছে।
মঙ্গলবার হাবিপ্রবির হর্টিকালচার বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. হাসানুর রহমান বাসসকে জানান, বাওবাব এমন একটি গাছ যা নিজের কাণ্ডে বিপুল পরিমাণ পানি সংরক্ষণ করতে পারে। শুষ্ক ও মরু অঞ্চলে টিকে থাকার জন্য গাছটি তার দেহে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার লিটার পর্যন্ত পানি জমা রাখতে সক্ষম। এ কারণেই একে ‘জলাধার গাছ’ বা ‘মরুভূমির পানির আধার’ বলা হয়।
তিনি বলেন, বাওবাব গাছের বৈজ্ঞানিক নাম Adansonia digitata এবং এটি মালভেসি (Malvaceae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। আফ্রিকার শুষ্ক অঞ্চলে জন্মানো এই গাছ কয়েক হাজার বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। আফ্রিকার কিছু বাওবাব গাছের বয়স এক হাজার বছরেরও বেশি বলে জানা যায়।
বিশাল আকৃতির এই বৃক্ষের কাণ্ড অত্যন্ত মোটা এবং স্পঞ্জের মতো গঠনের হওয়ায় প্রচুর পানি ধারণ করতে পারে। পূর্ণবয়স্ক একটি বাওবাব গাছের কাণ্ডের ব্যাস ৩০ ফুটেরও বেশি হতে পারে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় গাছটির শিকড় আকাশের দিকে আর কাণ্ড মাটির নিচে রয়েছে। এ কারণেই অনেকেই একে ‘উল্টো গাছ’ বলেও অভিহিত করেন।
বাওবাবের ফুল সাধারণত বর্ষাকালের শুরুতে সন্ধ্যার পর ফোটে এবং মাত্র ২৪ ঘণ্টা স্থায়ী হয়। তীব্র সুগন্ধযুক্ত এসব ফুলের পরাগায়নে প্রধান ভূমিকা পালন করে বাদুড় ও মথ। গাছটিতে বছরে প্রায় ছয় মাস পাতা থাকে এবং ফুলের রং লাল, হলুদ কিংবা সাদা হতে পারে।
গাছটির ফলও অত্যন্ত পুষ্টিগুণসম্পন্ন। প্রায় দেড় কেজি ওজনের ফলগুলো দেখতে অনেকটা নারকেলের মতো। ভিটামিন-সি, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম ও খাদ্যআঁশে সমৃদ্ধ হওয়ায় বাওবাব ফলকে ‘সুপারফ্রুট’ বলা হয়। টক-মিষ্টি স্বাদের এই ফল থেকে জুস, পাউডার ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি করা হয়। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে এটি ঔষধি উপাদান হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
শুধু ফল নয়, বাওবাব গাছের পাতা, ছাল, বীজ ও শেকড়ও বহুমুখী কাজে ব্যবহৃত হয়। গাছের ছাল থেকে দড়ি, কাপড়, ব্যাগ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী তৈরি করা যায়। বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতিতে ডায়রিয়া, জ্বর, প্রদাহ ও চর্মরোগের চিকিৎসায় এর বিভিন্ন অংশ ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
হাবিপ্রবির কৃষি অনুষদের কৃষি বনায়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মাদ শোয়াইবুর রহমান জানান, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিভিন্ন বিরল ও দুর্লভ প্রজাতির গাছ রোপণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন প্রয়াত অধ্যাপক ড. টি.এম.টি. ইকবাল। তাঁর দূরদর্শী উদ্যোগের ফলেই আজও বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনে অনেক অমূল্য ও বিরল গাছ সংরক্ষিত রয়েছে।
তিনি বলেন, বাওবাব শুধু একটি বিরল বৃক্ষই নয়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। খরা অঞ্চলে পানি সংরক্ষণ, পাখি ও বাদুড়ের আবাসস্থল তৈরি এবং মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে এ গাছ বিশেষ অবদান রাখে। বাংলাদেশে বাওবাব অত্যন্ত বিরল হলেও রাজশাহীর পুঠিয়া রাজবাড়ি এলাকায় একটি ঐতিহাসিক বাওবাব গাছ এখনো টিকে আছে।
এদিকে ল্যাব, ক্লাস ও পরীক্ষার ব্যস্ততা শেষে শিক্ষার্থীদের জন্য বোটানিক্যাল গার্ডেনটি হয়ে উঠেছে মানসিক প্রশান্তির অন্যতম স্থান। বিকেলের মৃদু বাতাসে গাছপালার ছায়াঘেরা পরিবেশে সময় কাটাতে প্রতিদিনই এখানে ভিড় করেন শিক্ষার্থীরা।
কৃষি অনুষদের ২১ ব্যাচের শিক্ষার্থী আশিক শাহারিয়ার ও জুলহাস ফেরদৌস বলেন, “পরীক্ষার চাপ থেকে কিছুটা মুক্তি পেতে আমরা নিয়মিত বোটানিক্যাল গার্ডেনে আসি। প্রকৃতির মাঝে সময় কাটালে নতুন করে শক্তি ফিরে পাই। নিজের ফ্যাকাল্টির সামনে এমন বিরল একটি গাছ দেখতে পাওয়া সত্যিই আনন্দের বিষয়।”
প্রকৃতির বিস্ময়কর সৃষ্টি বাওবাব গাছ শুধু হাবিপ্রবির বোটানিক্যাল গার্ডেনের সৌন্দর্যই বাড়াচ্ছে না, একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পরিবেশ সচেতনতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবেও ভূমিকা রাখছে।