মিঠা পানির মাছে উত্তরবঙ্গের সাফল্য, রাজশাহী এখন দেশের অন্যতম বৃহৎ সরবরাহ কেন্দ্র
উপশিরোনাম:
বছরে ৫ লাখ টনের বেশি উৎপাদন; ঢাকাসহ ২৫ জেলায় সরবরাহ, ভারতে বাড়ছে প্রক্রিয়াজাত মাছের রপ্তানি
নিজস্ব প্রতিবেদক:
স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে দেশব্যাপী বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান মিঠা পানির মাছ উৎপাদন ও সরবরাহকারী অঞ্চলে পরিণত হয়েছে রাজশাহী বিভাগ। উন্নত চাষাবাদ, আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক উদ্যোগের ফলে এ অঞ্চলের মৎস্য খাত এখন গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজশাহী বিভাগে উৎপাদিত মিঠা পানির মাছ বর্তমানে ঢাকাসহ দেশের অন্তত ২৫টি জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ ভারতেও বাংলাদেশি প্রক্রিয়াজাত মাছ রপ্তানির বড় একটি অংশ রাজশাহী থেকেই যাচ্ছে।
রাজশাহী বিভাগীয় মৎস্য দপ্তরের পরিচালক সাইফুদ্দিন ইয়াহিয়া জানান, বিভাগের আটটি জেলায় মোট ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৬৫৩টি পুকুরে মাছ চাষ হচ্ছে। এ খাতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার মানুষ। বছরে এখানে ৫ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি মিঠা পানির মাছ উৎপাদিত হয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর রাজশাহী বিভাগ থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বছরে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন মাছ সরবরাহ করা হয়। এ খাতকে কেন্দ্র করে প্রায় ৩ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
কার্প জাতীয় মাছ উৎপাদনে নাটোর ও নওগাঁ জেলা শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। প্রতিদিন রাজশাহী থেকে পাঁচ শতাধিক ট্রাকে জীবন্ত মাছ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। এর মধ্যে শুধু রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলা গ্রাম থেকেই প্রতিদিন প্রায় ৫০ ট্রাক মাছ ঢাকা ও অন্যান্য জেলায় সরবরাহ করা হয়।
পারিলা গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী মোশাররফ হোসেন জানান, তিনি গত ১৪ বছর ধরে বিশেষ জলীয় পদ্ধতিতে জীবন্ত মাছ ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় পাঠাচ্ছেন। প্রায় ২২ বিঘা জমির পুকুরে মাছ চাষ করে তিনি নিয়মিত বাজারজাত করছেন।
তিনি বলেন, একসময় ব্যবসা শুধু রাজশাহীতে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় জীবন্ত মাছ সরবরাহ করা হচ্ছে। একটি ট্রাকে প্রায় ১ হাজার ২০০ কেজি মাছ পরিবহন করা যায়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, অক্সিজেনযুক্ত পানিতে জীবন্ত মাছ পরিবহনের আধুনিক ব্যবস্থার কারণে রাজশাহীর মাছের চাহিদা দেশের বাজারে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বর্তমানে রাজশাহী থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিক্রি হয়।
মৎস্য কর্মকর্তারা জানান, আগে সীমিত আকারে মিশ্র পদ্ধতিতে মাছ চাষ হলেও এখন পুরো বিভাগজুড়ে আধুনিক ও বাণিজ্যিক পদ্ধতিতে মাছ উৎপাদন হচ্ছে। রুই, কাতলা ও মৃগেলের পাশাপাশি পাবদা, শিং, কই ও মাগুর মাছের চাষও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজশাহী থেকে নিয়মিত পাবদা মাছ ভারতে রপ্তানি হচ্ছে।
চাষিদের দক্ষতা বাড়াতে মৎস্য অধিদপ্তর প্রতি বছর ১ হাজার ৫০০ জনের বেশি মাছচাষিকে আধুনিক মৎস্য চাষ ও নিরাপত্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।
তবে মাছের খাদ্যের মূল্য এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন চাষিরা। তারা মনে করেন, মৎস্য খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি আর্থিক প্রণোদনা নিশ্চিত করা গেলে এ খাত আরও শক্তিশালী হবে এবং দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে।