
তদবির, অনিয়ম এবং প্রশাসনিক অদূরদর্শিতার কারণে চরম সংকটের মুখে পড়েছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এবং পদ্মা অয়েলের কাছে সংস্থাটির বকেয়া পাওনার পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে বেবিচকের পাওনা ৫ হাজার ৮৪২ কোটি ৯১ লাখ টাকার বেশি এবং পদ্মা অয়েলের পাওনা ২ হাজার ১০৮ কোটি ১৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পাওনা পরিশোধের জন্য একাধিকবার তাগাদা দেওয়া হলেও বিমান তা সম্পূর্ণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে।
বকেয়া নিয়ে অস্বস্তির মধ্যেই পদোন্নতি সংক্রান্ত নতুন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর বিমানের পার্সোনেল শাখা জ্যেষ্ঠতা ও নিয়মকানুন উপেক্ষা করে ১৩ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়। অথচ গত ৩ আগস্ট বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে চিঠি পাঠিয়ে এই পদোন্নতি প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। চিঠিতে প্রকৌশল শাখায় দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের পদোন্নতি না দেওয়ার নির্দেশনা ছিল। মন্ত্রণালয়কে উপেক্ষা করে এই পদোন্নতি দেওয়ায় সংস্থার অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা প্রকট হয়ে উঠেছে।
বিমানকর্মী ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, দীর্ঘ সময় ধরে পদোন্নতির ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে তদবির এবং ব্যক্তিগত প্রভাবকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের চর্চায় দক্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে, যা সরাসরি বিমানের সামগ্রিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এছাড়া ফ্লাইট শিডিউল বিপর্যয়, দীর্ঘ সময় লাগেজ পাওয়ার অপেক্ষা, মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং টিকিট বুকিং ও কল সেন্টারের সেবার মান নিয়েও যাত্রীদের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযোগ উঠছে। ইন-ফ্লাইট সেবার ক্ষেত্রেও দক্ষ জনবলের তীব্র সংকট রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে বিমান কর্তৃপক্ষের দাবি, গত বছরের জানুয়ারি থেকে নিয়মিত পাওনা পরিশোধের অংশ হিসেবে প্রতি মাসে ২৫ কোটি টাকা করে প্রদান করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি গত কয়েক বছর ধরে লাভজনক অবস্থানে থাকার দাবি করে আসছে, যার ধারাবাহিকতায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যাত্রী পরিবহন থেকে ৭৮৫ কোটি টাকা লাভের কথা জানানো হয়েছে। তবে বেবিচকের কর্মকর্তাদের প্রশ্ন, রেকর্ড মুনাফা অর্জন করলে বিপুল অংকের বকেয়া কেন এখনো অনাদায়ী রয়ে গেছে? বর্তমানে বিমানের বহরে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে, যার মধ্যে চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর। সংস্থাটি ভবিষ্যতে বহর সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে আরও ২১টি নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
পুরো বিষয়টি নিয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো ধরনের সরকারি অনিয়ম বরদাশত করা হবে না। মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট নির্দেশনা অমান্য করে পদোন্নতি প্রদানের ঘটনায় পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু সেই নির্দেশনার পরও পদোন্নতি দেওয়ায় মন্ত্রণালয়ের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।