
ঢাকা:
ভয়কে পেছনে রেখে সাহসকে সামনে এনে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, “আপনার একটি ভোট শুধু একটি সরকার নির্বাচন করবে না; এটি ১৭ বছরের নীরবতার জবাব দেবে, বাধাহীন ফ্যাসিবাদের জবাব দেবে এবং জাতিকে নতুনভাবে গড়ে তুলবে।”
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে গণভোট সামনে রেখে দেওয়া এই ভাষণে তিনি বলেন, বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক ও ভবিষ্যৎ-নির্ধারক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে। আর মাত্র একদিন পরই দেশজুড়ে একসঙ্গে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে—যা জাতির বহু বছরের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “যাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা বাংলাদেশ পেয়েছি এবং স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘ সংগ্রামের পর আজ গণতান্ত্রিক উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়াতে পেরেছি—সমগ্র জাতি তাদের কাছে চিরঋণী।” তিনি বলেন, জুলাইয়ের যোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ছাড়া এই নির্বাচন ও গণভোট কোনোটিই সম্ভব হতো না।
তিনি উল্লেখ করেন, এবারের নির্বাচনকে ঘিরে প্রচার-প্রচারণা পূর্ববর্তী যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় শান্তিপূর্ণ হয়েছে। মত ও আদর্শের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও সাধারণ মানুষ দায়িত্বশীল আচরণ করেছেন। এজন্য তিনি রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গণমাধ্যমকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের ধন্যবাদ জানান।
তবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশের মাঝেও কয়েকটি সহিংস ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে তিনি বলেন, গণতন্ত্রের চর্চায় কোনো প্রাণ ঝরে যাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি জানান, এবারের নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে এবং স্বতন্ত্রসহ মোট প্রার্থীর সংখ্যা দুই হাজারের বেশি—যা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে বিরল।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এবারের নির্বাচন কেবল একটি নিয়মিত নির্বাচন নয়; এটি একটি গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে জনগণের জাগরণের সাংবিধানিক প্রকাশ ঘটবে ব্যালটের মাধ্যমে। তাই এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।
গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এই ভোটের মাধ্যমে আমরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে—বৈষম্যহীন ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের দিকে, নাকি আবারও পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক বৃত্তে।” তিনি সব প্রার্থীর প্রতি আহ্বান জানান, ফলাফল যাই হোক না কেন, জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিতে।
ভাষণে নারী ও তরুণ ভোটারদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, নারীরাই ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা এবং দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। আর তরুণরা—যাদের স্বপ্ন ও শক্তিই আগামী বাংলাদেশের ভিত্তি—এই ভোট তাদের প্রথম সত্যিকারের রাজনৈতিক উচ্চারণ।
তিনি বলেন, “গত ১৭ বছর ধরে ভোটাধিকার থাকলেও আপনারা ভোট দিতে পারেননি। আজ সেই ইতিহাস বদলানোর দিন এসেছে। সাহস নিয়ে ভোট দিন—এই দেশ আর কোনোদিন তার তরুণ, নারী ও সংগ্রামী মানুষের কণ্ঠ হারাতে দেবে না।”