
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের জেরে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় নতুন করে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত মাত্র ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৩৬ জন বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে গেছেন। অথচ ২০২৫ সালের একই সময়ে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৬০ হাজার ৪৩৮ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে নতুন কর্মী প্রেরণ কমেছে প্রায় ৪১ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি জনশক্তি রপ্তানি খাতে একটি বড় সংকটের সূচনা মাত্র। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আগামী মাসগুলোতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা) জানিয়েছে, বর্তমানে যে সংখ্যক কর্মী বিদেশে যাচ্ছেন, তাদের বেশিরভাগই যুদ্ধ শুরুর আগে অনুমোদিত চাহিদা ও সম্পন্ন হওয়া ভিসার আওতায় যাচ্ছেন। নতুন করে শ্রমিক চাহিদা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় এর প্রকৃত প্রভাব আগামী মাসগুলোতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
বায়রার মতে, বর্তমানে সৌদি আরব ছাড়া বাংলাদেশের জন্য বড় কোনো শ্রমবাজার কার্যত উন্মুক্ত নেই। সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিয়োগ সীমিত, কাতার ও কুয়েতে নামমাত্র কর্মী যাচ্ছে এবং মালয়েশিয়ার বড় শ্রমবাজার এখনও বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপের কয়েকটি দেশে নতুন সুযোগ তৈরি হলেও দীর্ঘ ভিসা প্রক্রিয়া ও কনস্যুলার জটিলতার কারণে সাধারণ কর্মীরা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারছেন না।
তবে জনশক্তি রপ্তানিতে মন্দা দেখা দিলেও রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্টো ইতিবাচক চিত্র দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩ জুন ২০২৬ পর্যন্ত বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে এসেছে ৩৩ দশমিক ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ২৮ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার। ফলে এক বছরে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৮ দশমিক ২৫ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের নিরাপত্তা উদ্বেগ, বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে সরকারি প্রণোদনা এবং হুন্ডি প্রতিরোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারির কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। তবে নতুন কর্মী যাওয়ার হার কমতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
এদিকে সংকট মোকাবিলায় সরকার আগামী অর্থবছরে প্রায় ১৪ লাখ বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত ১১ মাসে মোট ৯ লাখ ৩৩ হাজার ৮১৫ জন কর্মী বিদেশে গেছেন।
সরকার দক্ষ ও পেশাদার কর্মী পাঠানোর মাধ্যমে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে কাজ করছে। মালয়েশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করতে কূটনৈতিক আলোচনা ও দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগও অব্যাহত রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারের উদ্যোগ এবং রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব কাটিয়ে উঠে বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হবে।