• বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০১ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
শাহজালাল বিমানবন্দরে ১৬ লাখ টাকার বিদেশি মদ জব্দ উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ নিয়ে কঠোর প্রধানমন্ত্রী সোনাতলা নদীর বৈদ্যুতিক তার চুরির অভিযোগ: সংবাদ প্রকাশের পর মাঠে পল্লী বিদ্যুৎ ✓  ইরানের সঙ্গে নতুন চুক্তির সুযোগ দেখছেন জেডি ভ্যান্স পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ: কেন থামছে না অস্থিরতা গাজার সংকটে দুবাইয়ে ১০ মিলিয়ন খাবারের প্যাকেট প্রস্তুতি ও ১১টি বোয়িং কিনতে আড়াই বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের সম্ভাবনা বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সৌজন্য সাক্ষাৎ আলোচনা করে সংবিধান সংশোধন করতে চায় সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিরাপদ অভিবাসন ও শ্রম আইন সংস্কারে ইইউর সঙ্গে আলোচনা

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ: কেন থামছে না অস্থিরতা

রিপোর্টার: / ৪ পঠিত
আপডেট: বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) নিয়োগ কেন্দ্রিক অস্থিরতা যেন থামছেই না। একের পর এক বিতর্কিত নিয়োগ ও পরবর্তীতে তা বাতিলের ঘটনায় চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগের পরপরই শিক্ষার্থীদের তীব্র বিক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে প্রশাসনকে, আবার কখনো প্রজ্ঞাপন জারির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা বাতিল করতে হচ্ছে। এসব ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে নিয়োগের আগে প্রার্থীদের যোগ্যতা ও তাদের সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য কেন যথাযথভাবে যাচাই করা হচ্ছে না। নিয়োগের পর বিতর্ক সামনে এলে ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে কেন নিয়োগের আগেই ত্রুটিগুলো শনাক্ত করা যাচ্ছে না, তা এখন বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) ও ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে চলমান আন্দোলন পরিস্থিতিকে নাজুক করে তুলেছে। চুয়েটে সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনরায় নিয়োগের দাবিতে টানা আটদিন ধরে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে নিয়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। অথচ সরকার মাত্র ৫৬ দিন দায়িত্ব পালনের পরই অধ্যাপক সায়েমকে সরিয়ে অধ্যাপক ড. শেখ শরিফুল আলমকে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। এদিকে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে নতুন ভিসি অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমানের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে গত ২৬শে সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে নেমেছেন। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট থেকে কাউকে ভিসি হিসেবে চান না। শিক্ষার্থীদের তীব্র প্রতিবাদের মধ্যেই অধ্যাপক লুৎফর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের বারিধারার অস্থায়ী কার্যালয়ে অনলাইনে যুক্ত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছরের মধ্যে দুবার ভিসি পরিবর্তনের নজির তৈরি হয়েছে। অষ্টম দিনের মতো চলা এই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের দাবির পক্ষে যোগ দিয়েছেন শিক্ষক, কর্মকর্তারাও। বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের পর ভিসি’র বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে। সেদিন থেকেই আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা।

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতিও ভিন্ন নয়। সেখানে অধ্যাপক ড. আলিমুল ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষক-কর্মকর্তারা দীর্ঘসময় ধরে আন্দোলনে রয়েছেন। গত ৭ই সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা পাঁচজনসহ মোট এগারোজন শিক্ষক-কর্মকর্তা গণপদত্যাগ করেন। এরপর থেকে তারা ভিসি বিরোধী মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। সরকারি দলের পট পরিবর্তনের পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ নিয়ে নিয়মিতই অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ১৪ই মে ভিসি নিয়োগের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা বাতিল করতে হয়েছিল। ড. মো. আনিসুর রহমানকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারির পর তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে সরকার সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়।

গাজীপুরের ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) নিয়োগ নিয়ে সৃষ্ট অস্থিরতা সংঘর্ষ পর্যন্ত গড়িয়েছে। ১৪ই মে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবালকে ডুয়েটের ভিসি নিয়োগ দিলে শিক্ষার্থীরা ‘ডুয়েট ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করেন। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন এবং ভিসিকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে বাধা দেন। ক্যাম্পাস থেকে ভিসি নিয়োগের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে বিরোধীপক্ষের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছিলেন। একইভাবে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯শে জুলাই অধ্যাপক ড. মো. নাজমুস সাদাতকে নিয়োগ দেয়া হলেও ৩৭ দিনের মাথায় তাকে সরিয়ে নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভিসি করা হয়। এছাড়া জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবিপ্রবি) ভিসি বদল নিয়েও শিক্ষাঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। ১৪ই মে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়াকে নিয়োগের পর ২৩ দিনের মাথায় ৬ই জুন নতুন প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আমির হোসেনকে জাবিপ্রবি’র ভিসি করা হয়। সে সময় বিষয়টি টাইপিং ভুলের কারণে বিভ্রান্তি তৈরি করেছিল বলে গুঞ্জন ছিল। এতে বিষয়টি সুরাহা হওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। এমনি পরিস্থিতি দাঁড়ায় যে, ভিসি যোগদান করার পরও ক্যাম্পাসে ঢুকতে বাধা দেয়া হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ‘নতুন ভিসিকে লাল কার্ড’ কর্মসূচির ডাক দেয়া হয়।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সার্চ কমিটির মাধ্যমেই ভিসি নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়। গত ১লা এপ্রিল গঠিত সার্চ কমিটিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেককে প্রধান এবং একই শাখার অতিরিক্ত সচিবকে সদস্য সচিব করা হয়। কমিটির অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মো. ফরিদুল ইসলাম, ইউজিসি’র সদস্য প্রফেসর মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের প্রফেসর ড. মো. মোর্শেদ হাসান। এত বড় একটি সার্চ কমিটির স্বচ্ছতা ও তাদের গোয়েন্দা তথ্যের গভীরতা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক ভিসি বলেন, ‘নিয়োগের পর পূর্বের কর্মকাণ্ডের ছবি সামনে এনে যেভাবে অপদস্থ করা হয়, তা অত্যন্ত অপমানজনক। সরকার যদি নিয়োগ দিয়ে আবার সরিয়ে দেয়, তবে কেন নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়াটি এত তাড়াহুড়ো করে বা ত্রুটিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা হয়?’ তিনি দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের সমালোচনা করে বলেন, দলীয় লোকদের ভেতর থেকেও যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা সম্ভব ছিল। রাজনৈতিক বা পপুলিস্ট সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নিয়োগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে বলে তিনি মনে করেন।

ইউজিসি’র সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ এস এম ফায়েজ মনে করেন, বর্তমান নিয়োগ প্রক্রিয়াগুলোর দুর্বলতার কারণে শিক্ষার্থীরা হতাশায় ভুগছেন। তার মতে, কোনো শিক্ষক যদি ভিসি হওয়ার জন্য লবিং করেন, তবে তিনি শুরুতেই অযোগ্যতার প্রমাণ দেন। সরকারকে পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে লবিং করা শিক্ষকদের আবেদন শুরুতেই বাতিল করা উচিত। আরেকটি সিনসিয়ার ও স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল এই অস্থিরতা নিরসন সম্ভব। সরকারকে পপুলিস্ট বা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ