
দেশের চলমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে জাতীয় সংসদে চারটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করেছে প্রধান বিরোধী দল। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনায় এই প্রস্তাবগুলো তুলে ধরা হয়। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে শিল্পকারখানাগুলোকে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ প্রদান এবং সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স সেল গঠনের দাবি জানানো হয়।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে এবং লোডশেডিংয়ের কারণে তাদের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত। তিনি অভিযোগ করেন, লংমার্চের সময় বিভিন্ন জেলায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতির যে চিত্র দেখা গেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অনেক এলাকায় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। তিনি সরকারকে সংকট গোপন না করে প্রকৃত অবস্থা জাতির সামনে তুলে ধরার আহ্বান জানান।
শফিকুর রহমান আরও বলেন, বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে জনগণের অর্থ অপচয় হচ্ছে, যা এক ধরনের ডাকাতি। তিনি দাবি করেন, সরকারি দলের পক্ষ থেকে মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ না নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। হিসাব অনুযায়ী, প্রায় চার থেকে সাড়ে চার কোটি গ্রাহকের কাছ থেকে মাসে প্রায় ১৯০ কোটি টাকা ডিমান্ড চার্জ এবং ৮০ থেকে ১৬০ কোটি টাকা মিটার ভাড়া আদায় করা হচ্ছে, যা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
সরকারকে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, “একটি দেশ যখন পাওয়ার ক্রাইসিসে ভোগে, তখন দেশটা পাওয়ারলেস হয়ে যায়। আমরা চাই না আমাদের জাতি পাওয়ারলেস হোক, আমরা চাই জাতি পাওয়ারফুল হোক।” তিনি সরকারের কাছে কোনো ক্রেডিট না চেয়ে নিঃস্বার্থভাবে টেকনিক্যাল এক্সপার্ট টিমের সহায়তার প্রস্তাব দেন। তবে সংসদে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সাথে বাস্তব কাজের অমিল থাকায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বিরোধী দলের প্রস্তাবের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ ইসলাম অমিত বলেন, বিগত সরকারের ভুল নীতির কারণেই বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, “১৭ বছরের জঞ্জাল ৬ মাসে পরিষ্কার করা সম্ভব নয়।” তবে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সংকট উত্তরণে কাজ করছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, “আই হ্যাভ এ প্ল্যান’, তার সাথে গলা মিলিয়ে আমরাও দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই— ‘উই হ্যাভ এ প্ল্যান’।”
প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, “যেই পরিস্থিতি আজ বিদ্যমান, আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে আগামী বছর যেন আমরা কিছুটা স্বস্তি অনুভব করতে পারি। আর ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের জ্বালানি খাতে কোনো সংকট থাকবে না।”
ক্যাপাসিটি চার্জ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বর্তমান সরকার বিদ্যুৎ খাতে আর কোনো নতুন ক্যাপাসিটি চার্জ দেবে না। তিনি জানান, নতুন করে অনুমোদিত তিনটি রেন্টাল পাওয়ার কোম্পানি ‘নো পাওয়ার, নো মানি’ ভিত্তিতে কাজ করবে। তিনি আরও বলেন, বিগত সরকার গ্যাস বা জ্বালানি নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করেছিল, যা ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার।
বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে সরকারের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী জানান, জরুরি প্রয়োজনে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে সর্বোচ্চ ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া দেশে প্রায় ৬ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে দ্রুত সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, গত ২৪ মে অফশোর বিডিং রাউন্ড উন্মুক্ত করা হয়েছে, যার মেয়াদ ৩০ নভেম্বর শেষ হবে। এছাড়া এ বছরের মধ্যেই ন্যূনতম দুটি নতুন এফএসআরইউ চুক্তির প্রক্রিয়া চলছে। মাতারবাড়ীতে ল্যান্ড বেইজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য জমি অধিগ্রহণ ও ট্রান্সেকশন অ্যাডভাইজার নিয়োগের কাজ শুরু হয়েছে।
তেল পরিশোধন সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি জানান, ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা তিনগুণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বড়পুকুরিয়ায় দেশীয় কয়লা দিয়ে ৬২০ মেগাওয়াটের নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু এবং পায়রায় দ্বিতীয় ধাপে ১৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের আলোচনা চলমান রয়েছে। প্রতিমন্ত্রী আশ্বস্ত করেন যে, জ্বালানি সংকট শুধু সম্পদের ঘাটতি নয়, বরং সিদ্ধান্তের গতি বাড়ানোর মাধ্যমে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে “তীব্র জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে বেকারত্ব সৃষ্টি এবং দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে মারাত্মক বিপর্যয় রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ” শীর্ষক প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তা সত্ত্বেও বোরো মৌসুমে কৃষকদের যেন কোনো ক্ষতি না হয়, সেজন্য সরকার ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম এক পয়সাও বাড়ায়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরবর্তীতে পাচার রোধে বাধ্য হয়ে সহনীয় মাত্রায় দাম সমন্বয় করা হয়েছে, যার কোনো ক্ষতিকর প্রভাব দেশের অর্থনীতি বা বাজেটে পড়েনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দেশের ভেতরে গ্যাস অনুসন্ধান না করে তারা বিদেশ নির্ভরতা বাড়িয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু এখন বিদ্যুতের প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রী যে নতুন রেন্টাল পাওয়ার অনুমোদন দিয়েছেন, সেখানে কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ নেই।”। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রাতারাতি চুক্তি বাতিলের সুযোগ নেই: বর্ডার পেরিয়ে বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, “আমরা জানি ওভার প্রাইজড (অতিরিক্ত দাম) দিয়ে জাতির পয়সা অপচয় করে বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু আমরা যদি এখন সেই চুক্তি বন্ধ করে দেই, তবে বিষয়টি আন্তর্জাতিক আর্বিট্রেশনে (সালিশি) যাবে এবং বিদ্যুৎ সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যাবে।