
২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ৩০টি অর্থনীতির একটি হয়ে উঠতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার। রোববার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’-এ দেওয়া বক্তব্যে তিনি বাংলাদেশের এই উজ্জ্বল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গতিশীল অর্থনীতি এবং দক্ষিণ এশিয়া, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল ও বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে দেশটির কৌশলগত গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আগামী কয়েক বছরে অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিবেচনায় বাংলাদেশের পরিধি ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা অনেক বড়। মাইকেল মিলারের ভাষায়, বাংলাদেশের জন্য ইইউর মূল বার্তা হলো—বাংলাদেশ যে গতি ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেখাবে, তার সঙ্গে তাল মেলাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, বাংলাদেশ তার উন্নয়ন যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশকে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন অংশীদার হিসেবে দেখছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর বাংলাদেশকে কেবল দাতা ও সাহায্যগ্রহীতার প্রচলিত কাঠামোয় দেখতে চায় না। বাংলাদেশের এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে মসৃণ ও সফল উত্তরণ নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন একত্রে কাজ করতে আগ্রহী। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) সম্ভাবনাও ইইউ যাচাই করতে চায়। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সম্ভাব্য এফটিএর আগে দুই পক্ষের মধ্যে প্রয়োজনীয় অভিন্ন ভিত্তি ও মানদণ্ড তৈরি হয়েছে কি না, তা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সম্পর্কের সাফল্য শুধু বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করবে না, বরং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করবে। এসব বিষয়কে কোনোভাবেই গৌণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিশেষ সহযোগিতার প্রস্তাব তুলে ধরে মিলার বলেন, ইউরোপীয় মূল্যবোধ ও বিনিয়োগের সমন্বয় ঘটিয়ে ইইউ বাংলাদেশে প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, দীর্ঘমেয়াদি মূলধন ও উদ্ভাবন নিয়ে আসতে চায়। বিশেষ করে সরকারি প্রশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পারে। রাষ্ট্রদূত বলেন, ইইউ চায় বাংলাদেশ যেন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার চাপ সামলে একটি আধুনিক ও শক্তিশালী অর্থনীতি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। একই সঙ্গে দেশটি যেন উন্মুক্ত, সার্বভৌম, সহনশীল ও বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারে—এই লক্ষ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই অংশীদারত্বের প্রস্তাব। তিনি আরও বলেন, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন মানে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়, বরং বর্তমানের ক্রমবর্ধমান লেনদেননির্ভর বিশ্বে টিকে থাকা। অনিশ্চয়তার এই সময়ে দেশ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এমন নির্ভরযোগ্য অংশীদার প্রয়োজন, যারা প্রতিটি সম্পর্ককে কেবল একটি লেনদেন হিসেবে দেখে না। মিলারের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সেই দীর্ঘমেয়াদী ও নির্ভরযোগ্য কৌশলগত সহযোগী হতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সঙ্গে রাজনৈতিক রূপান্তর, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক চাপ, জলবায়ু ঝুঁকি এবং জটিল বৈশ্বিক পরিস্থিতি সামলে বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, শ্রম অধিকার ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সুশাসনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশকে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করতে হলে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা এবং পূর্বানুমানযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।