
‘ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়’—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে সংসদে তুমুল বিতর্ক
ঢাকা, ৯ জুন : দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডকে ঘিরে চলমান বিতর্ক জাতীয় সংসদে নতুন মাত্রা পেয়েছে। ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ, চেয়ারম্যান পরিবর্তন ও গ্রাহক আন্দোলন নিয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সংসদে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
মঙ্গলবার (৯ জুন) জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে বিরোধী দলের সদস্যরা ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করেন। এ সময় জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, মির্জা ফখরুল ইসলামও ইসলাম নয়, আবার জামায়াতে ইসলামও ইসলাম নয়।” তার এ বক্তব্যের পর সংসদে ব্যাপক আলোচনা ও প্রতিক্রিয়ার জন্ম নেয়।
দীর্ঘদিন ধরেই ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে মালিকানা পরিবর্তন, ঋণ অনিয়ম, ব্যবস্থাপনা সংকট এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নিয়ে নানা বিতর্ক চলছে। সম্প্রতি ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি আরও আলোচনায় আসে।
সংসদে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের অভিযোগ করেন, অতীতে এস আলম গ্রুপের মাধ্যমে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ইসলামী ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে এবং বর্তমানে আবারও বিতর্কিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হচ্ছে, যা আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বা চেয়ারম্যান নিয়োগের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এ নিয়ে আপত্তি থাকলে আইন পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন, ইসলামী ব্যাংককে কেন্দ্র করে একটি মহল পরিকল্পিতভাবে গ্রাহক আন্দোলন সৃষ্টি করছে। তার দাবি, “পর্দার আড়াল থেকে আন্দোলন পরিচালনা করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।”
উল্লেখ্য, গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর থেকেই ব্যাংকটির কিছু গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডার বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন।
সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বৈধ শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার সংরক্ষণে সরকার বদ্ধপরিকর। পাশাপাশি যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ঋণ নিয়ে পরিশোধ করেনি, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি নাবিল গ্রুপসহ ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ারও ইঙ্গিত দেন।
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, “ইসলাম নয়” ধরনের বক্তব্য রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আলোচনাকে একই পরিসরে নিয়ে আসায় বিতর্ক আরও বাড়তে পারে। তবে সরকারপক্ষের দাবি, বক্তব্যটির উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দলের পরিচয়ের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরা।
সব মিলিয়ে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন, শেয়ারহোল্ডারদের অসন্তোষ, ঋণ অনিয়মের অভিযোগ এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।