• শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১২ অপরাহ্ন

রাজস্ব আয় ঘাটতিতে বিকল্প ঋণের উৎস খুঁজছে সরকার

রিপোর্টার: / ৫ পঠিত
আপডেট: শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

রাজস্ব আয় প্রত্যাশিত হারে না বাড়ায় বাজেট ঘাটতি মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা ক্রমশ বাড়ছে। সরকারের লক্ষ্য ছিল অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ভারসাম্য বজায় রেখে ব্যয় নির্বাহ করা, কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতায় তা পুরোপুরি সম্ভব হচ্ছে না। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত অর্থবছরে সরকার মোট ১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে ৫৮ হাজার কোটি টাকা বিদেশি উৎস থেকে এলেও বাকি ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকাই নেওয়া হয়েছে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা ও সঞ্চয়পত্র থেকে। উল্লেখ্য, সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা, যা ১২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

দেশের ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ কমাতে এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার এখন নতুন অর্থায়নের বিকল্প পথ খুঁজছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে সার্বভৌম বন্ড ইস্যু এবং অবকাঠামো প্রকল্পের বিপরীতে সুকুক বা ইসলামী বন্ড ছাড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সার্বভৌম বন্ডের সম্ভাবনা যাচাই ও কৌশল নির্ধারণে প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গণিকে প্রধান করে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির পরামর্শ ও পর্যালোচনার ভিত্তিতেই চীন, জাপান, হংকং ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বন্ড ছাড়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

বন্ড ইস্যুর এই কার্যক্রমে বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান জেপি মরগান ও এইচএসবিসির পরামর্শ নিচ্ছে অর্থ বিভাগ। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ৫০ কোটি থেকে ১০০ কোটি ডলার সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে চীনের বাজারে ‘পান্ডা বন্ড’, জাপানে ‘সামুরাই বন্ড’, হংকংয়ে ‘ডিমসাম বন্ড’ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ডলারভিত্তিক বন্ড ছাড়ার প্রক্রিয়া প্রক্রিয়াধীন। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সম্মতির পর বিষয়টি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী সুকুকের ওপরও জোর দিচ্ছে সরকার। অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের নেতৃত্বে এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২০২০ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকার সুকুক ইস্যু করা হলেও তার বড় অংশই অ-বিক্রয়যোগ্য ছিল। এখন স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী বিক্রয়যোগ্য সুকুক ইস্যুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছ থেকেও বাজেট সহায়তা পাওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাংক ১৫০ কোটি ডলার এবং এডিবি ১৪০ কোটি ডলারের সহায়তা চুক্তি করেছে। এডিবির সাথে পাঁচ বছর মেয়াদী ৫ বিলিয়ন ডলারের ‘ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিবছর বাড়তি ১০০ কোটি ডলারের ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।

তবে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ গ্রহণের বিষয়টি বেশ চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মূল্যায়নে বাংলাদেশের ঋণমান ‘নিম্ন ঝুঁকি’ থেকে ‘মধ্যম ঝুঁকি’তে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া মুডিস ও এসঅ্যান্ডপির মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং কমিয়ে দেওয়ায় বন্ডের বাজারমূল্য ও সুদের হার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন সতর্ক করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক সার্বভৌম বন্ডের ঝুঁকি ও খরচ তুলনামূলক অনেক বেশি। শ্রীলঙ্কার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, স্বল্পমেয়াদী উচ্চ সুদের বন্ড পরিশোধের চাপ ও বৈদেশিক মুদ্রার সংকট কীভাবে দেশটিকে সংকটে ফেলেছিল, তা ভুলে যাওয়া উচিত নয়। তার মতে, বৈশ্বিক উৎস থেকে নেওয়া ঋণ বিশ্বব্যাংক বা এডিবি’র মতো বহুপক্ষীয় ঋণের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল এবং এর মেয়াদের নিশ্চয়তাও কম।

অধ্যাপক ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হকও এ বিষয়ে সতর্কতার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বন্ডের সাফল্য এর কাঠামো এবং বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের ওপর নির্ভর করে। ইন্দোনেশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার আর্থিক সংকটের উল্লেখ করে তিনি জানান, বৈদেশিক মুদ্রায় উচ্চ সুদের বন্ড অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপের কারণ হতে পারে। শেষ পর্যন্ত এগুলো সবই ঋণ, তাই রাজস্ব আহরণ বাড়িয়ে পরনির্ভরশীলতা কমানোই সরকারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। রাজস্ব বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিশ্চিত করা ও অপচয় রোধ করা এখন সময়ের দাবি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রাজস্ব আয় বাড়িয়ে ঋণ কমানোর পরিকল্পনা থাকলেও নানা কারণে তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফলে অর্থবছরের শুরু থেকেই বাজেট বাস্তবায়নে ঋণ করতে হচ্ছে সরকারকে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ ছাড়া আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডিস ও এসঅ্যান্ডপি ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ঋণমান কমিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কমিটি তাদের পর্যালোচনা প্রতিবেদন অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অনুমোদন পাওয়া গেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। চাকরির আরও তথ্য: এর প্রধান বিনিয়োগকারী সাধারণত চীনের নাগরিকরা হলেও কিছু ক্ষেত্রে অন্য দেশের বিনিয়োগকারীরাও এতে অংশ নিতে পারেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ