
নিজস্ব প্রতিবেদক :
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার উত্থান ছিল অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত। রাজনীতিতে আগ্রহহীন এক গৃহবধূ থেকে টানা চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন। দলের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর বিপর্যস্ত বিএনপিকে সংগঠিত করে তিনি তিনবার দলকে রাষ্ট্রক্ষমতায় নিয়ে যান এবং দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাস গড়েন।
বিএনপির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি খালেদা জিয়া দলের প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণ করেন। এর মাত্র এক বছরের মধ্যেই, ১৯৮৩ সালের মার্চে তিনি বিএনপির জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরের বছর ১২ জানুয়ারি তাকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই বছরের ১০ মে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। গত মে মাসে সেই দায়িত্ব পালনের ৪১ বছর পূর্ণ হয়।
রাজনীতিতে তার এই যাত্রা কোনো পূর্বপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ছিল না। ব্যক্তিজীবনে তিনি রাজনীতি থেকে দূরেই ছিলেন। স্বামী জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকাকালীন কিংবা রাষ্ট্রপতি থাকলেও তাকে কখনো সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকায় দেখা যায়নি। তবে ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপিতে যে নেতৃত্বশূন্যতা তৈরি হয়, তা দলকে গভীর সংকটে ফেলে। সেই বাস্তবতায় দলীয় নেতাদের অনুরোধ ও চাপেই রাজনীতিতে যুক্ত হন খালেদা জিয়া।
সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে তিনি ধীরে ধীরে বিরোধী রাজনীতির প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। ১৯৮৩ সালে সাত দলীয় জোট গঠনের মাধ্যমে সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন তিনি। নির্বাচনের বাইরে রাজপথে থেকে আন্দোলনের কৌশল গ্রহণ করায় তিনি পরিচিত হন ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে। এ সময় একাধিকবার তাকে গ্রেপ্তার ও আটকও করা হয়।
এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হলে খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। ওই নির্বাচনে তিনি পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবকটিতেই জয়ী হন। তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি আরও দুইবার প্রধানমন্ত্রী হন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনো কোনো নির্বাচনে পরাজিত হননি।
তার শাসনামলে অর্থনীতি ও সামাজিক খাতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে ভূমিকার জন্য ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সাময়িকী ফোর্বস–এর বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় তিনি ২৯তম অবস্থানে ছিলেন।
তবে তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় আসে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে। দুটি দুর্নীতি মামলায় তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং দুই বছরের বেশি সময় কারাবন্দী থাকতে হয়। ২০২০ সালের মার্চে করোনা মহামারির সময় নির্বাহী আদেশে তার সাজা স্থগিত করে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর ছয় মাস পরপর সেই মেয়াদ বাড়ানো হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরদিন নির্বাহী আদেশে তিনি পূর্ণ মুক্তি পান।
উন্নত চিকিৎসার জন্য ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি তিনি যুক্তরাজ্যের লন্ডনে যান। সেখানে ১১৭ দিন চিকিৎসা শেষে ৬ মে দেশে ফেরেন। এরপর শারীরিক জটিলতার কারণে তাকে একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভূমিকা মূল্যায়ন করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে তিনি একজন ক্যারিশম্যাটিক নেতা। তার ভাষায়,
“এরশাদ ও শেখ হাসিনার মতো দুই স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আড়াই দশক ধরে লড়াই করেছেন খালেদা জিয়া। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে উঠে এসে তিনি সফল শাসক ও রাজপথের প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। দক্ষিণ এশিয়া ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তার মতো নেতৃত্ব বিরল।”
রাজনীতিতে অনিচ্ছুক এক নারীর এই দীর্ঘ পথচলা শেষ পর্যন্ত তাকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেত্রীতে পরিণত করেছে। ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি, দলীয় দায়িত্ববোধ ও সময়ের বাস্তবতা মিলিয়ে গড়ে ওঠা এই নেতৃত্ব দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী অধ্যায় হয়ে থাকবে।